জুয়েল আশরাফ »
দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রাপথ পেরিয়ে অবশেষে বাঁশখালি পৌঁছায় হারিছ। বাস থেকে নামতেই তার মনে হয়, পৃথিবীর বাতাস যেন জায়গাভেদে আলাদা স্বভাবের হয়। ঢাকার বাতাসে ধুলো, ধোঁয়া আর তাড়াহুড়ো লেগে থাকে। কিন্তু এখানে বাতাসের গায়ে লবণের গন্ধ। সমুদ্র চোখে পড়ছে না, অথচ তার উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে। দূরে কোথাও ঢেউ ভাঙছে। সেই শব্দ কানে না এলেও বুকের ভেতর এসে লাগছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আষাঢ়ের আকাশ। পশ্চিমে মেঘের নিচে সূর্যের শেষ আলো রক্তমাখা কমলার মতো ছড়িয়ে আছে।
হারিছ কাঁধের ব্যাগটা একটু ঠিক করে নেয়।
বয়স চৌত্রিশ। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক। সংখ্যার সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। মানুষকে সে খুব সহজে বিশ্বাস করে না, আবার অবিশ্বাসও করে না। সে শুধু হিসাব মিলিয়ে দেখতে চায়। এই বাঁশখালিতে তার আসার কারণও যেন এক অদ্ভুত হিসাব। দুই সপ্তাহ আগে এক পুরোনো পরিচিত মানুষ ফোন করে জানিয়েছিলেন।
আপনি কি হারিছ সাহেব?
জি।
আপনার বাবার ব্যাপারে কিছু কথা আছে। সম্ভব হলে একবার বাঁশখালি আসবেন।
হারিছ ভেবেছিল, কেউ হয়তো প্রতারণা করছে। কারণ তার বাবা আবদুল মালেক মারা গেছেন প্রায় সাত বছর আগে। মৃত মানুষের ব্যাপারে নতুন করে আর কী কথা থাকতে পারে? সে ফোন কেটে দিয়েছিল। কিন্তু লোকটি আবার ফোন করেছিল। শান্ত কণ্ঠে বলেছিল, আপনার বাবা জীবিত থাকতে একটা কাজ করেছিলেন। সেই কাজের শেষ অংশটা এখনো বাকি। আপনি না এলে সেটা আর শেষ হবে না।
সেদিন থেকেই হারিছের অস্বস্তি শুরু হয়। তার বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। সৎ মানুষ। জীবনে কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। তাহলে এমন কী কাজ তিনি করে গেছেন, যার জন্য সাত বছর পর একজন অচেনা মানুষ ছেলেকে ডেকে পাঠায়?
বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। বৃষ্টির পানি এখনো টিনের চাল থেকে টুপটাপ ঝরছে। চায়ের দোকানের মালিক জিজ্ঞেস করে, কোথা থেকে আসছেন ভাই?
ঢাকা।
কোথায় যাবেন?
হারিছ মোবাইল বের করে ঠিকানাটা দেখায়। লোকটি ঠিকানা দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে, ওই বাড়িতে?
জি।
লোকটা যেন কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। চায়ের কাপে চিনি নেড়ে দিয়ে শুধু বলে, রাত হওয়ার আগে পৌঁছে যান।
কেন?
লোকটি হাসে।
বৃষ্টির রাতে এদিকের রাস্তা ভালো না।
কথাটা সাধারণ। কিন্তু তার হাসিটা সাধারণ নয়। রিকশা পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলে ওঠে হারিছ। চালকের নাম সাইফুল। রাস্তায় দুই পাশে পাহাড়ের ঢাল, সুপারি গাছ, ধানক্ষেত। বৃষ্টি আবার শুরু হয়। সাইফুল বলে, আপনি শহরের মানুষ?
হ্যাঁ।
প্রথম আসছেন?
হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ নীরবতা। হঠাৎ সাইফুল জিজ্ঞেস করে, আবদুল মালেক স্যারের ছেলে?
হারিছ অবাক হয়।
আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?
এই এলাকায় এমন মানুষ কম আছে, যারা তাকে চেনে না।
কিন্তু তিনি তো কখনো এখানে থাকেননি।
সাইফুল আর উত্তর দেয় না। বৃষ্টির শব্দ হঠাৎ যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে।
বাড়িটা পাহাড়ের পাদদেশে। পুরোনো দোতলা। সামনে বিশাল কড়ই গাছ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন সত্তরের কাছাকাছি বয়সী একজন মানুষ। তিনি এগিয়ে এসে হারিছের হাত ধরে বলেন, এসেছ বাবা?
কণ্ঠে এমন এক স্বস্তি, যেন বহুদিনের অপেক্ষা শেষ হয়েছে। লোকটির নাম কাসেম। হারিছকে ভেতরে বসিয়ে তিনি ধীরে ধীরে কথা শুরু করেন।
তোমার বাবা আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।
হারিছ চুপ করে থাকে।
বিশ বছর আগে ঘূর্ণিঝড়ের রাতে আমার মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। আমি সব হারিয়ে ফেলি। ঋণের চাপে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন তোমার বাবা এখানে শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন সরকারি প্রশিক্ষণের কাজে।
হারিছ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। সে তো কখনো শুনেনি। কাসেম বলেন, তিনি আমাকে টাকা দেননি। তার চেয়েও বড় জিনিস দিয়েছিলেন। তিন মাস আমার পাশে ছিলেন। ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছেন, মানুষকে বুঝিয়েছেন, আমাকে আবার দাঁড় করিয়েছেন।
হারিছের চোখ ধীরে ধীরে ভিজে ওঠে। বাবা এসব কখনো বলেননি। একবারও না। কাসেম উঠে আলমারি খুলে একটি পুরোনো মোবাইল ফোন বের করেন।
এটা তোমার বাবার।
হারিছ বিস্মিত।
কীভাবে?
তিনি শেষবার এখানে এসে ভুলে রেখে গিয়েছিলেন। পরে যোগাযোগ করতে করতে সময় চলে যায়। তারপর শুনলাম তিনি মারা গেছেন। ফোনটা আমি রেখে দিই।
ফোনটা বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কাসেম সেটি যত্ন করে কাপড়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। যেন সেটি কোনো মূল্যবান উত্তরাধিকার।
রাত গভীর হয়। বাইরে বৃষ্টি। বিদ্যুৎ চলে গেছে। হারিছ বারান্দায় বসে থাকে। তার মনে হতে থাকে, সে আসলে তার বাবাকে কোনোদিন চিনতেই পারেনি। সে শুধু বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থেকেছে। মানুষটাকে চেনেনি। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে কথোপকথনের শব্দ ভেসে আসে। দুই যুবক। সম্ভবত কাসেমের ছেলেরা। একজন বলছে, আব্বা সব সত্যি বলেননি। অন্যজন ফিসফিস করে, চুপ। হারিছ অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুনে ফেলে। প্রথমজন বলে, ওনার বাবাই তো আমাদের জমির কাগজ নিজের নামে লিখে নিতে পারতেন। কেউ জানত না। কিন্তু তিনি করেননি। উল্টো আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
হারিছের বুক ধক করে ওঠে। জমি? কোন জমি?
পরদিন সকালে কাসেম নিজেই সব বলেন। ঘূর্ণিঝড়ের পরে বহু মানুষের কাগজপত্র হারিয়ে যায়। সুযোগ নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জমি দখল করতে শুরু করে। সরকারি নথি যাচাইয়ের দায়িত্বে সাময়িকভাবে ছিলেন আবদুল মালেক। একটি ভুল করলেই কয়েক বিঘা জমি তার নিজের নামে নেওয়া সম্ভব ছিল। কেউ ধরতে পারত না। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং যাদের জমি ছিল, তাদেরই ফিরিয়ে দেন। কাসেমের চোখ ভিজে ওঠে।
তোমার বাবা বলেছিলেন, অন্যের জমিতে দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেকে কখনো মাথা উঁচু করে হাঁটতে শেখানো যায় না।
হারিছ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। এতদিন সে মনে করত, বাবা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। আজ বুঝতে পারে, সাধারণ মানুষ হওয়াই সবচেয়ে কঠিন।
ফেরার দিন। আকাশ পরিষ্কার। সমুদ্র দেখতে যায় হারিছ। ঢেউ একের পর এক এসে তীর ছুঁয়ে ফিরে যাচ্ছে। কোনো ঢেউ নিজের জন্য কিছু রেখে যায় না। আসে। স্পর্শ করে। ফিরে যায়। হঠাৎ তার মনে হয়, তার বাবার জীবনও যেন এমনই ছিল। নিঃশব্দ। অহংকারহীন। কিন্তু অসংখ্য মানুষের বালুকাবেলায় অদৃশ্য দাগ রেখে গেছে।
ঢাকায় ফিরে গিয়ে হারিছ প্রথমবার বাবার পুরোনো আলমারি খুলে বসে। কোনো গুপ্তধন পায় না। কোনো গোপন নথিও নয়। শুধু একটি ব্যবহৃত কলম, কিছু পুরোনো বই, আর একটি জীর্ণ মানিব্যাগ। সে কলমটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকে। তারপর অফিসে গিয়ে বহুদিনের একটি অভ্যাস বদলে ফেলে। এক বৃদ্ধ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বকেয়া বিল, যেটা সবাই নানা অজুহাতে আটকে রেখেছিল, সে নিজে হিসাব মিলিয়ে সেদিনই ছাড়িয়ে দেয়।
সহকর্মী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, এত কষ্ট করলে কেন?
হারিছ মৃদু হেসে জানালার বাইরে তাকায়। তার মনে হয়, দূরের কোথাও সমুদ্রের গন্ধ ভেসে আসছে। সে শুধু বলে, সব হিসাব টাকায় মেলে না। কিছু হিসাব মানুষ রেখে যায় মানুষের ভেতর।
সেদিন বিকেলে ঢাকায় বৃষ্টি নামে। হারিছের মনে হয়, বাঁশখালি থেকে সে কোনো স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে আসেনি। সে নিয়ে এসেছে এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার, একজন নীরব মানুষের সততার ভার। আর সেই ভারই, আশ্চর্যভাবে, তার কাঁধকে আগের চেয়ে অনেক হালকা করে দেয়।






















































