আরজাত হোসেন »
ভালো লেখা আর কালজয়ী লেখা এই দুটো এক জিনিস নয়। তাহলে ভালো লেখা কী, কালজয়ী লেখা কী ?
অনেক ছড়াকার খুব ভালো লিখেন, ভালো প্যাটার্ন দেন । ছন্দ, মাত্রা, তাল, লয়, রূপক, অন্ত্যমিল এমনকি খুব ভালো অনুপ্রাসও প্রয়োগ করেন। কিন্তু অবাক বিষয় হচ্ছে এই লেখা অত্যন্ত সুপাঠ্য হলেও তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভালো লাগে । কেন এমন হয় ? কারণ লেখার আগে স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে না। এটি অনেকটা ছয় কিলো পথের স্লিপার বাসের মতো !
তাহলে কালজয়ী লেখা কীভাবে সৃষ্টি করব ? প্রতিষ্ঠিত কবিরা কীভাবে কালজয়ী ছড়া, কবিতা লিখেছিলেন ?
ধরুন আপনি কোনো একটি ঘটনা লিখলেন- কিন্তু কবি সেখানে ঘটনার রহস্য, সমাধান, অপকার ও উপকার লিখেছেন। ফলস্বরূপ আপনার লেখাটি শক্তিশালী কিন্তু কবির লেখাটি কালজয়ী । অর্থাৎ, যদি একজন লেখক শুধু ঘটনা লেখেন, লেখাটি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হতে পারে। কিš‘ যদি সেই ঘটনার ভেতর থেকে মানুষের চিরন্তন সত্য, ন্যায়, স্বাধীনতা, ভালোবাসা, ভয়, আশা বা মর্যাদার কথা তুলে আনেন, তাহলে সেই লেখা বহু প্রজন্ম বেঁচে থাকতে পারে। সমসাময়িক রাজনীতি বা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর লেখা ছড়া, কবিতা বা গান খুব শক্তিশালী হতে পারে। তা মানুষকে আন্দোলিতও করতে পারে। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা হারায়।
আধুনিক কবিগণ অনেকটা ধৈর্যহীন । লেখার প্যাটার্ন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে লেখা শুধুমাত্র সুপাঠ্য হবে । কিš‘ কখনো কালজয়ী হতে পারবে না । কালজয়ী হওয়ার জন্য একটি লেখাতেই ব্যয় করতে হয় অনেক সময়। তাই নিজের লেখা অনন্ত সময় ধরে টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি লেখায় দিতে হবে যথেষ্ট পরিমাণ সময়, ভবিষ্যতের প্রাসঙ্গিকতা এবং মানুষের সাথে সম্পর্ক ।
কেন বর্তমান কবিগণ কালজয়ী লেখা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ ?
সমসাময়িকের উপর নির্ভর: কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা বা বিতর্ককে কেন্দ্র করে লেখা শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু যদি তা বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় পৌঁছাতে না পারে, তবে সময়ের সঙ্গে তার আবেদন কমে যায় ।
কবিতায় চমক পঙক্তি অনুপস্থিত: কখনও কখনও চমক, স্লোগান, উক্তি, প্রবাদ ইত্যাদি কবিতায় অনুপস্থিত থাকায় কবিতা কম টিকে থাকে ।
দ্রুত প্রকাশের চেষ্টা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত প্রকাশের সুযোগ থাকায় অনেক লেখা দীর্ঘ সময় ধরে ঘষেমেজে তৈরি হয় না। বরং লেখার মান যাচাই না করতেই তা প্রকাশে ব্যস্ত হয়।
ধৈর্যের অভাব: অনেক ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম বহুবার সংশোধিত হয়েছে। আজকের দ্রুতগতির প্রকাশ সংস্কৃতিতে সেই প্রক্রিয়া কম দেখা যায়।
সাধারণ ভালো লেখা এবং কালজয়ী লেখার মধ্যে পার্থক্য গুলো দেখলেই বোঝা যায়।
সাধারণ ভালো লেখা
একটি নির্দিষ্ট সময়কে ভালোভাবে প্রকাশ করে
সমসাময়িক পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে
একটি ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হতে পারে
পড়ে ভালো লাগে
জনপ্রিয়তা দ্রুত আসতে পারে
সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব কমে যেতে পারে
কালজয়ী লেখা
সময়কে অতিক্রম করে
বহু প্রজন্মের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকে
ঘটনার ভেতর থেকে মানুষের চিরন্তন সত্য তুলে আনে
বারবার পড়লে নতুন অর্থ আবিষ্কার হয়
স্বীকৃতি পেতে অনেক সময়ও লাগতে পারে
সময়ের সঙ্গে গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে
আমরা যখন কোনো লেখা লিখতে যাব, তার আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হবে। কী করলে একটি লেখা সময়কে অতিক্রম করবে ? কীভাবে আগামী প্রজন্মেও লেখাটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে ? এই লেখাটির অর্থ শুধু কি একটি মাত্র ঘটনাকে উল্লেখ করে নাকি এর ভিতরে রাখতে হবে ঘটনার উত্তর এবং এর ভবিষ্যত প্রতিক্রিয়া?
এসব বিষয় মাথায় রেখে যখন একটি ছড়া বা কবিতা লেখা হবে, তখন সেই লেখাটিই হতে পারে কালজয়ী।
তা ছাড়া লেখার ক্যাটাগরির উপর নির্ধারণ করে কোন লেখাতে কী কী প্রয়োগ করতে হবে । একটি ছড়ার উদাহরণ দেওয়া যাক।
একটি ছড়ায় কেবলমাত্র ছন্দ, মাত্রা, অন্ত্যমিল, রূপক, এগুলো থাকলে হবে না । ছন্দের পাশাপাশি রাখতে হবে পাঠকের চাহিদা, কোন শ্রেণীর পাঠকের জন্য লিখছি, ভবিষ্যতের সাথে প্রাসঙ্গিক হবে কিনা । ছড়ার ক্ষেত্রে কোন বয়সীদের জন্য লিখব তা মাথায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । শিশুর বয়স অনুযায়ী সহজ শব্দ ব্যবহার করতে হবে। জটিল বাক্য ও দুর্বোধ্য শব্দ এড়িয়ে চলতে হবে । পড়লে যেন মুখে লেগে থাকে। শুনলেই শিশুর মুখে মুখে ফিরতে পারে এমন লয় থাকা দরকার। সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে ছড়াটি থেকে শিশুর কী উপকার হবে। শুধু ছন্দ বা তালের মাধ্যমে শিশুকে আন্দোলিত করাই কি প্রধান উদ্যেশ্য ? নাকি একইসাথে শিশুর জন্য শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থিত রাখতে হবে?
ছড়ায় অবশ্যই শিশুর আনন্দ ও শিক্ষার বিষয় উপস্থিত থাকা অত্যাবশ্যক ।
তাই আমাদের কালজয়ী লেখা সৃষ্টির লক্ষ্যে এগোতে হবে। লেখাকে সংশোধন, পরিমার্জন ও আত্মসমালোচনার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে। তাৎক্ষণিকতার সংস্কৃতি হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাধা, তাই এটি পরিহার করতে হবে । সমসাময়িক ঘটনায় অতিরিক্ত নির্ভর হওয়া যাবে না । ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিতে হবে । ভাষার প্রতি যথেষ্ট সাধনা করতে হবে। লেখার চেয়ে বেশি পড়তে হবে। দ্রুত স্বীকৃতি পাওয়ার আশা ছাড়তে হবে। গভীর জীবন-উপলব্ধি করতে হবে । সবসময় মাথায় রাখতে হবে – আমি কি সময়ের খবর লিখছি, নাকি মানুষের চিরন্তন সত্য লিখছি? আমার ভাষা কি শুধু তথ্য বহন করছে, নাকি শিল্পও সৃষ্টি করছে? লেখাটি কি আজকের জন্য, নাকি আগামী প্রজন্মও এতে নিজেদের খুঁজে পাবে? আমি কি দ্রুত প্রকাশের জন্য লিখছি, নাকি দীর্ঘ¯’ায়ী মানের জন্য লিখছি?
এসব বিবেচনা করেই আমাদের প্রত্যাশা রাখা উচিত আজকের সাহিত্য হবে আগামী দিনের সোনার মুকুট।






















































