ফারুক হোসেন সজীব »
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো এমন কোনো বই পড়েছ, যার পাতা খুললেই মনে হয় তুমি অন্য একটি জগতে চলে গেছ? সেখানে কখনো থাকে মজার কোনো প্রাণী, কখনো অদ্ভুত কোনো বন্ধু, কখনো রাজা-রানি, আবার কখনো এমন কোনো ছোট্ট ঘটনা, যা তোমাকে অনেকক্ষণ ভাবিয়ে রাখে। শিশুদের জন্য এমন আনন্দের জগৎ তৈরি করেছিলেন একজন অসাধারণ লেখক। তাঁর নাম- বিয়াট্রিস শেঙ্ক দ্য রেনিয়ার্স। বিয়াট্রিস জন্মগ্রহণ করেন ১৬ আগস্ট ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লাফায়েতে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্রপত্রিকায় লিখতেন। পরে তিনি ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। লেখক হওয়ার আগে তিনি সমাজসেবা, বিজ্ঞাপন লেখা ও শিক্ষামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নেয় শিশুদের গল্পের পৃথিবী। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই দ্য জায়ান্ট স্টোরি। বইটির ছবিগুলো এঁকেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী মরিস সেনডাক। প্রথম বই থেকেই বোঝা গেল, বিয়াট্রিস শিশুদের জন্য এমন গল্প লিখতে চান, যেখানে থাকবে কল্পনা, আনন্দ এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ। এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর নানা বই। এ লিটল হাউস অব ইয়োর ওন প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। পরের বছর আসে হোয়াট ক্যান ইউ ডু উইথ আ শু। একটি সাধারণ জুতোকেও যে শিশুর কল্পনা কত বিচিত্রভাবে দেখতে পারে, এই ধরনের ভাবনাই তাঁর লেখাকে মজার করে তুলেছিল। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় দ্য স্নো পার্টি। পরে আসে দ্য লিটল গার্ল অ্যান্ড হার মাদার। এসব বইয়ে শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, পরিবার, কল্পনা ও আনন্দকে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছিল। বিয়াট্রিস বুঝতেন, শিশুদের কাছে ছোট্ট একটি ঘটনাও অনেক বড় আনন্দের কারণ হতে পারে। তবে তাঁর সবচেয়ে পরিচিত বইগুলোর একটি হলো মে আই ব্রিং আ ফ্রেন্ড। বইটি ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়। গল্পে একটি শিশু রাজা ও রানির সঙ্গে দেখা করতে যায় এবং তার বন্ধু হিসেবে নানা প্রাণীকে সঙ্গে নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে গল্পটি এমন এক আনন্দময় কল্পনার জগৎ তৈরি করে, যেখানে মানুষের সঙ্গে প্রাণীদের বন্ধুত্বও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই বইটির ছবিগুলো এঁকেছিলেন ইতালীয় শিল্পী বেনি মন্ট্রেসর। ১৯৬৫ সালে বইটি ক্যালডেকট মেডেল লাভ করে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ক্যালডেকট মেডেল মূলত অসাধারণ চিত্রাঙ্কনের জন্য দেওয়া হয়। তাই বইটির লেখক ছিলেন বিয়াট্রিস এবং চিত্রকর ছিলেন বেনি মন্ট্রেসর। বিয়াট্রিসের সাহিত্যকর্ম শুধু এই একটি বইয়ে থেমে থাকেনি। তিনি লিখেছেন হাউ জো দ্য বিয়ার অ্যান্ড স্যাম দ্য মাউস গট টুগেদার। এই বইয়ে একটি ভালুক ও একটি ইঁদুরের বন্ধুত্বের গল্প শিশুদের আনন্দ দেয়। তিনি পরিচিত রূপকথাকেও নতুনভাবে শিশুদের সামনে তুলে ধরেছেন। রেড রাইডিং হুড রিটোল্ড ইন ভার্স ফর বয়েজ অ্যান্ড গার্লস টু রিড দেমসেলভস বইয়ে লিটল রেড রাইডিং হুডের পরিচিত গল্পকে ছন্দের মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। জ্যাক অ্যান্ড দ্য বিনস্টক-এর মতো পুরোনো গল্পও তিনি শিশুদের উপযোগী করে উপস্থাপন করেছেন। বিয়াট্রিসের লেখার আরেকটি মজার দিক ছিল তাঁর ছদ্মনাম ব্যবহার। তিনি তামারা কিট নামেও লিখতেন। এই নামে তাঁর দশটি বই প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব সিলি বিলি এবং দ্য বয় হু ফুলড দ্য জায়ান্ট। অর্থাৎ একই লেখকের কলম থেকে কখনো বেরিয়ে এসেছে হাসির গল্প, কখনো রূপকথা, কখনো ছড়া এবং কখনো কল্পনার দুরন্ত অভিযান। তিনি শুধু লেখক ছিলেন না, শিশুদের বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি স্কলাস্টিক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং লাকি বুক ক্লাব-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি শিশুদের বই নিয়ে কাজ করে যান। ফলে তিনি নিজের বই লেখার পাশাপাশি আরও অনেক শিশুর কাছে ভালো বই পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিলেন। বিয়াট্রিস জীবনে পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছিল ছবির বই, ছড়া, কবিতা, রূপকথার পুনর্কথন এবং শিশুদের জন্য নানা আনন্দময় রচনা। সিং আ সং অব পপকর্ন নামের শিশুদের কবিতা সংকলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখার সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল শিশুদের প্রতি ভালোবাসা। তিনি শিশুদের সব সময় ভালোবাসাতেন। তাদের কল্পনাশক্তিকে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর গল্পে শিশুরা প্রশ্ন করে, কল্পনা করে, বন্ধুত্ব করে এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করে। বিয়াট্রিস শেঙ্ক দ্য রেনিয়ার্স ১ মার্চ ২০০০ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু একজন লেখকের জীবন শেষ হয়ে গেলেই তাঁর গল্পের জীবন শেষ হয় না। তাঁর বইয়ের পাতায় আজও শিশুদের জন্য রয়ে গেছে কল্পনার দরজা। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যখন কোনো শিশুতোষ বই খুলবে, তখন মনে রেখো, একটি বই কখনো শুধু কয়েকটি পৃষ্ঠার সমষ্টি নয়। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে বিশাল এক পৃথিবী। বিয়াট্রিস শেঙ্ক দ্য রেনিয়ার্স সেই পৃথিবীর দরজা শিশুদের জন্য আরও বড় করে খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর গল্পের মাধ্যমে শিশুরা শিখতে পারেন কীভাবে কল্পনার জগতে বিচরণ করতে হয়! আর যে শিশুরা কল্পনার ডানা মেলে, তার কাছে একটি ছোট্ট বইও হয়ে উঠতে পারে বিশাল এক পৃথিবী! বিশাল এক আকাশ!





















































