টপ নিউজ

লাইটারেজ থেকে মাদার ভেসেল পোর্ট

ছবি: শোয়েব ফারুকী

রুশো মাহমুদ »

ভূ-রাজনীতির নানা সমীকরণে বঙ্গোপসাগর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পরিবর্তনশীল পরিবেশে বঙ্গোপসাগর অভূতপূর্ব গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বশক্তির নজরে সাগরতীরের চট্টগ্রাম। দ্বন্ধ ও ঝুঁকির মাঝেও আছে অপার সম্ভাবনা। চট্টগ্রামকে প্রতিযোগিতামূলক রিজিওনাল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পুরানো ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ আর ধীমান সিদ্ধান্তে লাভের গন্তব্যে পৌঁছানো অসম্ভব নয়।

---------

উপমহাদেশের পূর্ব ও পূর্বাঞ্চালীয় বিশাল অর্থনৈতিক পশ্চাতভূমির সহজতর সামুদ্রিক করিডোর হচ্ছে চট্টগ্রাম। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য – আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ যা একত্রে সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত কিংবা ল্যান্ড লক রাষ্ট্র নেপাল ও ভূটান চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে পারছে না। একটি আঞ্চলিক আমদানি-রফতানি কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রাম গড়ে উঠতে পারলে লাভ হবে দেশের পুরো অর্থনীতির। এর সুফল শুধু বাংলাদেশ একা নয় পাবে প্রতিবেশী দেশসহ সবপক্ষ।

আমাদের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রাম। প্রকৃতিদত্ত স্বাভাবিক এই পোতাশ্রয় বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টন আমদানি পণ্য খালাস হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গো মিলিয়ে বন্দরের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বন্দরের এত এত সম্ভাবনা তারপরেও সম্ভাবনা ও বাস্তবের মধ্যে বিরাট ফারাক, যা সত্যিই দুঃখজনক। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের মতো আমদানি ও ৮৫ শতাংশ রফতানি পণ্য পরিবাহিত হলেও এ স্বাভাবিক পোতাশ্রয়টি এরই মধ্যে একটি লাইটারেজ পোর্টে পরিণত হয়ে গেছে।

বেশি ড্রাফটের জাহাজগুলো বন্দরের বাইরে বঙ্গোপসাগরের আউটার এনকরেজে নয়তো কুতুবদিয়ার কাছাকাছি সাগরে নোঙর করতে হয়, যেখান থেকে লাইটারেজ ভেসেল বা কোস্টারে পণ্য খালাস করে বন্দরের জেটিতে নিয়ে আসতে হয়। আরো বড় মাদার ভেসেল হলে সেই ভেসেল থেকে সিঙ্গাপুরে বা কলম্বো বন্দরে পণ্যের কনটেইনারগুলো আনলোড করে ‘কনটেইনারবাহী জাহাজের’ মাধ্যমে আমদানীকৃত পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে নিয়ে আসতে হয়। অন্যদিকে রফতানি পণ্যেরও বেশির ভাগ কনটেইনার জাহাজে ভরে ওই দুই বন্দরের মাদার ভেসেলগুলোয় তুলে দিতে হয়।

এসব কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি পণ্য পরিবহনের খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর বন্দরের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ বেশি পড়ছে, সময়ও লাগছে অনেক বেশি। অথচ এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এখন বড় জরুরি। স্রেফ সরকারের অবহেলা ও অমনোযোগ এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বন্দর এরই মধ্যে একটি ‘লাইটারেজ পোর্টে’ পরিণত হয়ে আছে। অথচ সরকার বন্দরের এ সীমাবদ্ধতা নিরসনে প্রস্তাবিত ‘বে-টার্মিনাল’ নির্মাণকে যথাযথ অগ্রাধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। পরিকল্পনা গ্রহণ করেও বাস্তবায়ন করতে না পারাটা একটা বড় ব্যর্থতা।

ফিডার জাহাজের উপর নির্ভরশীল খণ্ডিত নেটওয়ার্কের পরিবর্তে গভীর এবং আরও দক্ষ গেটওয়ে বন্দর প্রয়োজন। কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং হয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন বন্দর ব্যবস্থাপনায় প্রবেশ করতে হবে বাংলাদেশকে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পোতাশ্রয়ে মাদার ভেসেল ও বৃহৎ কনটেইনারবাহী জাহাজ নোঙর করতে পারে না। গভীরতা কম হওয়ায় মাত্র ১৮ শতাংশ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে জোয়ারের সময়ই জাহাজ ঢুকতে বা বের হতে পারে। এছাড়া কর্ণফুলি নদীতে দু’টি বাঁক থাকায় ১৯০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের জাহাজ বন্দরে ঢুকতে পারে না। আর গভীরতা কম থাকায় সাড়ে ৯ মিটারের বেশী গভীরতার জাহাজও বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না।

বড় জাহাজগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙর করার পর ছোট ছোট জাহাজ বা ট্রলারে মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে আনা-নেওয়া করা হয়। ফলে একদিকে সময় বেশি লাগে, অন্যদিকে ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ।

দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম সম্ভাব্যতা যাচাই ২০০৯ সালে সম্পন হয়। জায়গা নির্ধারণ করা হয় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে। ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সেই বন্দর নির্মাণের কাজ আমরা শুরু করতে পারিনি। যদিও ২০১২ সালে সোনাদিয়া দ্বীপে সমুদ্র বন্দর তৈরির প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বেশ কয়েকবছর ধরে ঐ প্রকল্পের উন্নয়ন কাজে কোনো অগ্রগতি ছিল না।

এরপর জাপান নিয়ে আসে ‘বিগ বি’ ধারণা। মানে ‘দ্য বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’। এ কৌশলগত পরিকল্পনায় এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগ, শিল্পাঞ্চলসহ সমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে ‘বিগ বি’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এর বাস্তব রূপ দিতে দেশটির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ২০১৬ সালে একটি জরিপ করে মাতারবাড়ীতে বন্দর নির্মাণের পরামর্শ দেয়।

একটি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং একটি ফিডার বন্দরের মধ্যে পার্থক্য কেবল ড্রাফ্ট গভীরতা বা ঘাটের দৈর্ঘ্যের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক পরিচয়ের মৌলিক পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।

একটি গভীর সমুদ্র বন্দর বিশ্বের বৃহত্তম ক্যারিয়ারকেও আকর্ষণ করতে পারে, মালবাহী খরচ কমাতে পারে, ট্রানজিট সময় কমাতে পারে, বিদেশী বিনিয়োগকে উদ্দীপিত করতে পারে। মাতারবাড়ি একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের পথ দেখাবে। যেখানে থাকবে না ড্রাফ্ট এবং জোয়ার-ভাটার সীমাবদ্ধতা।

মাঝে চট্টগ্রাম বন্দরের ফান্ড স্থানান্তর করে পায়রা বন্দর নির্মাণের জোড় তৎপরতা ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে পায়রা বন্দরকে ‘গভীর সমুদ্রবন্দর’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নকে অবহেলা করে কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। পরে ওই প্রকল্প পরিত্যাগও করা হয়। সিদ্ধান্তটা  ছিল পুরোই খামখেয়ালির, ছিল না কোনো ভালো ফিজিবিলিটি স্টাডি।

কৌশলগত সংযোগস্থলের কেন্দ্রে অবস্থিত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর। এর অবস্থান সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে ২২/২৩ কিলোমিটার দূরত্বে মহেশখালী উপজেলার উত্তর-পশ্চিম অংশে। আমাদের একমাত্র প্রকৃত গভীর সমুদ্র বন্দর যেখানে সরাসরি মেইনলাইনের ভেসেল বা জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম। যেখানে বাংলাদেশ কেবল ফিডার রুটের শেষ বিন্দু নয় বরং বিশ্বব্যাপী শিপিং নেটওয়ার্কের সংযোগস্থল। পুরানো ব্যবস্থার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে একটি প্রতিযোগিতামূলক লজিস্টিক হাব হয়ে উঠবে বাংলাদেশ।

বিশ্ব বাণিজ্যে সক্রিয় একটি কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়াটা সময়ের দাবি। বাগাড়ম্বর রাজনীতির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের উন্নয়নভাবনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাদ দিতে হবে রাজনৈতিক স্বার্থ, অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা আর সমন্বয়হীনতা। কমাতে হবে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার ফারাক। তবেই বাঁচবে আগামীর স্বপ্ন আর আশা।