নিজস্ব প্রতিবেদক, মহেশখালী >>
একসময় মহেশখালীর জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা ছিল কোহেলিয়া নদী। ভোর হলেই শত শত মাছ ধরার ট্রলার সাগর থেকে ফিরে ভিড়ত নদীর ঘাটে। নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেত লবণ, মাছ ও শুঁটকি। দুই তীরজুড়ে ছিল কর্মচাঞ্চল্য। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল মৎস্য, লবণ ও চিংড়ি অর্থনীতির বিশাল বলয়।
সেই কোহেলিয়া এখন নাব্যতা সংকটে ধুঁকছে। নদীর তলদেশে জমেছে পলির স্তর, কোথাও কোথাও জেগে উঠেছে চর। থমকে গেছে নৌ চলাচল, কমেছে মাছের উৎপাদন। নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় জীবিকার সন্ধানে পেশা বদল করছেন কিংবা এলাকা ছাড়ছেন বহু জেলে।
সরেজমিনে মহেশখালীর কালারমারছড়া, ধলঘাটা, মাতারবাড়ি ও হোয়ানক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর অনেক অংশে পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। জোয়ারের সময়ও বড় ট্রলার চলাচলে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। নদীর বুকের বিভিন্ন অংশে পলি জমে তৈরি হয়েছে চর।
স্থানীয় জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও মাছভর্তি ট্রলার অনায়াসে ঘাটে ফিরত। এখন অনেক ক্ষেত্রে মাঝনদীতে মাছ নামিয়ে ছোট নৌকায় করে কিংবা অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে ঘাটে আনতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে পরিবহন ও শ্রম ব্যয়। কমছে জেলেদের প্রকৃত আয়।
মাছ কমেছে, বদলে গেছে জেলেদের জীবন
কালারমারছড়া ইউনিয়নের মোহাম্মদ শাহ ঘোনা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রমিজ মাঝির জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে নদীতে জাল ফেলে। তার ভাষায়, একসময় কোহেলিয়ায় জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও আগের মতো মাছ মেলে না।
আয় কমে যাওয়ায় গ্রামের অনেক জেলেই পেশা বদল করেছেন। কেউ সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে চলে গেছেন অন্য জেলায়। অনেকেই এখন দিনমজুরের কাজ করছেন।
শুধু জেলেই নন, কোহেলিয়ার ওপর নির্ভরশীল চিংড়ি চাষিরাও পড়েছেন সংকটে। নদীকে ঘিরে একসময় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য চিংড়িঘের। এসব ঘের থেকে বছরে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হতো বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি। নদীর নাব্যতা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সংকটে বাগদা চিংড়ি চাষেও নেমে এসেছে ধস।
স্থানীয়দের হিসাবে, প্রায় চার হাজার জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষভাবে কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদীর নাব্যতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে তাদের আয়ের প্রধান উৎস।
কৃষি ও লবণ শিল্পেও ধাক্কা
কোহেলিয়ার নাব্যতা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে কৃষি ও লবণ শিল্পেও। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীর ও বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্ষায় জোয়ারের লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে নদীপথে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় লবণ ও শুঁটকি পরিবহনে বাড়ছে খরচ। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একসময় নদীপথে কার্গো বোঝাই করে লবণ, মাছ ও শুঁটকি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। এখন বিকল্প পথে পরিবহন করতে গিয়ে প্রতি মণ লবণে অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ টাকা খরচ হচ্ছে।
নাব্যতা সংকটের কারণ কী?
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৬ সালের পর থেকে কোহেলিয়া দ্রুত ভরাট হতে শুরু করে। তাদের দাবি, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নদীতে পলি জমা এবং দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় মাটি ভরাট, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রভাবও নদীর ওপর পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হক বলেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে নদী ভরাট হয়েছে—এ অভিযোগ সঠিক নয়। প্রকল্পের কোনো বর্জ্য বা পলি নদীতে ফেলা হয় না এবং নির্মাণকাজের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হয়নি।
নদী বাঁচানোর দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন—বাপার মহেশখালী শাখার সভাপতি মোছাদ্দেক ফারুকী বলেন, কোহেলিয়া এখন মৃতপ্রায়। এ নদীর মৃত্যু মানে হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকার মৃত্যু। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন এবং পরিবেশগত ক্ষতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, কোহেলিয়া পুনঃখননের দাবিতে তারা হাইকোর্টে মামলা করেছেন। নদী রক্ষায় সভা, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও নদী গবেষক মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, উন্নয়নের নামে একটি নদী ধ্বংস হয়ে গেলে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। কোহেলিয়া শুধু একটি নদী নয়, এটি একটি জনপদের জীবনরেখা। তাই নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম বলেন, নদী একটি জীবন্ত সত্তা। কোহেলিয়াকে যেভাবে সংকুচিত করা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী হারাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, কোহেলিয়া এ অঞ্চলের প্রাণ ছিল। এখন নদীটি ধ্বংসের পথে। নদী রক্ষায় সরকারের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নদী ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা গেলেও নদী রক্ষায় সেই তৎপরতা দেখা যায় না। হাইকোর্ট দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই কোহেলিয়াকেও জীবন্ত রাখতে হবে।
তার দাবি, নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে অনেক জেলে পেশা বদলে লামা-আলীকদমের পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পুনঃখননের উদ্যোগ
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বলেন, কোহেলিয়া নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত খননকাজ শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।
নদী বাঁচলেই বাঁচবে জনপদ
প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ কোহেলিয়া নদী মহেশখালীর কালারমারছড়া, হোয়ানক, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নের মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি শুধু একটি জলধারা নয়; এই নদী একটি জনপদের অস্তিত্ব ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদী পুনঃখনন, পলি ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ, পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি নিতে হবে।
তা না হলে একদিন কোহেলিয়া হয়তো শুধু মানচিত্রেই থাকবে—বাস্তবে থাকবে না তার প্রাণ। আর নদীর সঙ্গে হারিয়ে যাবে মহেশখালীর মৎস্যসম্পদ, লবণ ও চিংড়ি অর্থনীতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা এবং হাজারো মানুষের স্বপ্ন।




















































