সামছুল আলম শিমুল »
অফিস থেকে বেরোতেই আজ পুলকের রাত ১০টা বেজে গেল। সচরাচর সে সাতটার দিকেই বের হয়। কিন্তু আজ কাজের চাপে দেরি হয়ে গেছে। অবশ্য রাত ১০টা এই শহরে তেমন একটা রাত নয়, বরং রাতের প্রথমভাগ বলা চলে।
পুলকের অফিসটা মেইন রোড থেকে বেশ খানিকটা দূরে। রিকশায় মিনিট পনেরো পেরিয়ে তারপর মেইন রোডে উঠতে হয়। সেখান থেকে বাসে করে বাসায় ফিরতে হয়।
অফিস থেকে রাস্তায় নামতেই ভ্যাপসা হাওয়া গায়ে লাগল। পুলক বুঝে গেল আকাশে মেঘ জমেছে। যেকোনো সময় ঝুম বৃষ্টি নামবে। তবু সে রিকশায় উঠে বসল। চাইলে রাতটা অফিসেই কাটিয়ে দিতে পারত। থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাসায় না ফিরলে মায়ের ওষুধ খাওয়ানো হবে না। মা নিজে নিজে ওষুধ চিনে খেতে পারে না।
রিকশা থেকে ছোট্ট বাসস্টপটায় নামার পরমুহূর্তেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
ঢাকা শহরের বাসস্টপগুলো সাধারণত নোংরা থাকে। ময়লা, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, ডাবের খোসা- কী নেই! কিন্তু কোনো এক কারণে এই ছোট্ট স্টপটা সবসময়ই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আজ আরও বেশি। বৃষ্টির জন্য হয়তো লোকজন কম বের হয়েছে।
একমাত্র বাতিটা টিমটিম করে জ্বলছে। কয়েকটা পোকা তার চারপাশে ভনভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে। আশপাশের কোনো বাড়ি থেকে হাস্নাহেনার সুবাস ভেসে আসছে। বৃষ্টি হলেই এই গন্ধটা পায় পুলক।
দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাসের দেখা মিলল না। বৃষ্টি থামারও লক্ষণ নেই। ঠিক তখনই দ্রুত পায়ে হেঁটে এক তরুণী ছাউনির নিচে এসে বেঞ্চে বসে পড়ল।
পুলক আর বসল না। এমন নির্জন জায়গায় গভীর রাতে অপরিচিত একজন মেয়ের পাশে গিয়ে বসাটা তার ঠিক শোভন মনে হলো না। শহরে ভদ্রতার মুখোশ পরে কত অঘটনই তো ঘটে!
সময় গড়াতে লাগল। বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। চারপাশের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠছে। মেয়েটিও যে অস্বস্তিতে আছে, সেটা বোঝা যায়। দু-একটা কথা বললে হয়তো দুজনেরই অস্বস্তি কাটত। কিন্তু সে-ই যদি আগে কথা বলে, মেয়েটি কী ভাববে?
শেষ পর্যন্ত পুলকই নীরবতা ভাঙল।
-যেভাবে বৃষ্টি ঝরছে, আজ আর থামবে বলে মনে হচ্ছে না।
মেয়েটি ভেজা আঁচলটা গুছিয়ে একবার তার দিকে তাকাল। তারপর আবার রাস্তার দিকে চোখ ফেরাল।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল,
-আমারও তাই মনে হচ্ছে।
কণ্ঠে ভদ্রতা ছিল, তবে সতর্কতাও ছিল।
এই প্রথম ভালো করে তাকাল পুলক। বেগুনি রঙের শাড়ি, সাদা ব্লাউজ, খোলা চুল। ঠোঁটের গোলাপি লিপস্টিক অনেকটাই মুছে গেছে। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ। গায়ের রং শ্যামলা হলেও মুখে এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য।
আবার নীরবতা।
কয়েক মিনিট পরে মেয়েটিই জিজ্ঞেস করল,
-এই রোডে কি বাস সবসময় এত কম চলে?
-রাত হয়ে গেছে। এমনিতেই কম চলে। বৃষ্টি হলে আরও কমে যায়।
মেয়েটি মাথা নেড়ে চুপ করে রইল।
আরও কিছুক্ষণ পরে সে আবার বলল,
-আপনি কোথায় যাবেন?
পুলক বুঝল, অপরিচিত মানুষটাকে সে আর সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে দেখছে না।
-লালমাটিয়া। আপনি?
-বেইলি রোড।
-অফিস থেকে ফিরছেন?
মেয়েটি হেসে মাথা নাড়ল।
-না। বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম। ও অনেকবার বারণ করেছিল বের হতে। কথা শুনলে ভালো হতো।
পুলক এবার বেঞ্চের এক কোণায় বসল।
-আমি অবশ্য বৃষ্টি হবে জেনেই বেরিয়েছি। কিন্তু বাস পাব না, ভাবিনি। মায়ের ওষুধের সময় হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি ধীর গলায় বলল,
-আশা করি খুব বেশি দেরি হবে না।
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।
হঠাৎ মেয়েটি বলল,
-হাস্নাহেনার গন্ধটা খুব নাকে লাগছে।
-হাস্নাহেনা বুঝি পছন্দ না?
-একেবারেই না। বৃষ্টিতে কামিনীর গন্ধটা আমার বেশি ভালো লাগে।
-কামিনীও ভালো লাগে। তবে আমি হাস্নাহেনাকেই এগিয়ে রাখব।
মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,
-মজার ব্যাপার জানেন? আমাদের দুই বোনের নামও ফুলের নাম থেকেই রাখা।
পুলকের জানতে ইচ্ছে করল, নামটা কী। কিন্তু প্রশ্নটা করল না। কিছু কিছু নাম না জানাই ভালো। নাম জানলে মায়া বেড়ে যায়।
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
-কী করেন আপনি?
-একটা প্রকাশনীতে চাকরি করি।
-তাই নাকি! বইয়ের সঙ্গে থাকেন তাহলে?
-বলা যায়।
-পড়তে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসেন?
উত্তর না দিয়ে পুলক ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা
মেয়েটির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-আপনি কবিতা পড়েন!
-সুযোগ পেলেই।
বইটা হাতে নিয়ে মেয়েটি আলতো করে পাতা ওল্টাতে লাগল।
বৃষ্টিভেজা রাত, টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির একটানা শব্দ, চারপাশে ভেসে বেড়ানো হাস্নাহেনার সুবাস- সব মিলিয়ে সময় যেন থমকে ছিল। অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে এত সহজে কথা বলা যায়, পুলকের জানা ছিল না।
ঠিক তখনই বাসের হর্ন আর হেলপারের ডাক ভেসে এল-
-বেইলি রোড! বেইলি রোড!
মেয়েটি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
-আমার বাস।
-আচ্ছা… ভালো থাকবেন।
মেয়েটি শুধু মুচকি হেসে বাসে উঠে জানালার পাশে বসল। বাস ছাড়ার আগে একবার হাত নাড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসটা বৃষ্টির পর্দার আড়ালে মিলিয়ে গেল।
পুলক অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ পড়ল বেঞ্চটার দিকে। কবিতার বইটা সেখানে পড়ে আছে।
সে বইটা তুলে নিল। পাতা ওল্টাতেই একটি শুকনো কামিনী ফুল মাটিতে খসে পড়ল। পুলক থমকে গেল। মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল মেয়েটির কথা-
‘বৃষ্টিতে কামিনীর গন্ধটা আমার বেশি ভালো লাগে।’
ফুলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল সে। চারপাশে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছে হাস্নাহেনার সুবাস।
পকেট থেকে ফোন বের করে রুমা আন্টিকে কল দিল।
-আন্টি, একটা সাহায্য করবেন? মায়ের ওষুধটা একটু খাইয়ে দেবেন? আজ পৌঁছাতে একটু দেরি হবে।
ওপাশ থেকে আশ্বাস পেয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে ছাউনির বাইরে বেরিয়ে এল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মুহূর্তেই তাকে ভিজিয়ে দিল। হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো- কিছু কিছু মানুষের নাম জানা হয় না বলেই তারা অনেকদিন মনে থেকে যায়।




















































