স্বপন শর্মা »
ঝাউ-জঙ্গলে ঘেরা বিশাল এক জায়গা। একে পুরোপুরি বন বলা যায় না। কারণ বনের মতো নানা রকম গাছপালা, জলাশয় আর ঘন ঝোপঝাড় এখানে নেই। তবে সারি সারি উঁচু ঝাউগাছের জন্য জায়গাটা সবসময়ই একটু অন্ধকার অন্ধকার লাগে। দিনের বেলায় এখানে পাখিদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। শালিক, দোয়েল, বুলবুলি আর কাঠঠোকরা খাদ্যের খোঁজে উড়ে বেড়ায়। কিন্তু সূর্য ডুবে গেলে দৃশ্যটা বদলে যায়। তখন একে একে বেরিয়ে আসে নিশাচর প্রাণীরা। পেঁচা, বেজি, বাদুড় আর নানা রকম সাপ নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাত যত গভীর হয়, নিশাচর প্রাণীদের আনাগোনাও তত বাড়তে থাকে। এই ঝাউ-জঙ্গলে একদল জোনাকপোকাও বাস করত। অন্ধকার নামলেই তারা ছোট ছোট সবুজাভ আলো জ্বালিয়ে উড়ে বেড়াত। দূর থেকে মনে হতো যেন আকাশের তারারা নেমে এসেছে গাছের ফাঁকে ফাঁকে। তবে জোনাকদের এই আলো একদমই পছন্দ ছিল না সাপেদের। বিশেষ করে এক বৃদ্ধ গোখরা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সমালোচক।
জোনাকপোকারা সাপের খাবার নয়। তাদের সাথে সাপেদের কোনো শত্রুতাও নেই। তবুও গোখরার অভিযোগের শেষ ছিল না। -এই আলো জ্বালাও কেন? ‘রাতকে রাতের মতো থাকতে দাও!’ -’তোমাদের জন্য চারপাশ অশান্ত হয়ে যায়!’ প্রায়ই এমন কথা শুনতে হতো জোনাকদের। একদিন গভীর রাতে গোখরা এতটাই বিরক্ত হয়ে গেল যে সে তার লেজ দিয়ে কয়েকটি জোনাককে আঘাত করতে শুরু করল। কেউ গাছের ডালে গিয়ে পড়ল, কেউ আবার ভয়ে দূরে সরে গেল। সেদিন জোনাকপোকারা খুব কষ্ট পেল। তারা বুঝতেই পারছিল না, তাদের অপরাধটা কোথায়।
পরদিন রাতে একটি পুরোনো ঝাউগাছের নিচে জোনাকদের সভা বসল। একটি জোনাক দুঃখ করে বলল– ‘আমরা তো কারও ক্ষতি করি না। তাহলে আমাদের সাথে এমন আচরণ কেন?’
আরেকটি বলল– ‘শুধু চুপ করে থাকলে তো সমস্যার সমাধান হবে না।’ সবাই অনেকক্ষণ আলোচনা করল। অবশেষে তারা ঠিক করল, গোখরার কাছেই সরাসরি কারণ জানতে হবে।
কয়েকদিন পরে আবার সুযোগ এল।
গভীর রাতে গোখরা যখন একটি শুকনো গুঁড়ির পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিল, তখন কয়েকটি সাহসী জোনাক তার সামনে উড়ে গেল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট জোনাকটি বলল– ‘গোখরা কাকা, আমাদের সঙ্গে এরকম ব্যবহার কেন করেন?’
প্রশ্ন শুনেই গোখরা রেগে আগুন হয়ে উঠল।ফোঁস! ফোঁস! তার ফণা উঠে গেল। ‘আমাকে প্রশ্ন করার সাহস কেমনে হলো তোমাদের?’ গোখরার গর্জনে অনেক জোনাক ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। কিন্তু এবার তারা পালাল না। ছোট্ট জোনাকটি কাঁপা গলায় বলল– ‘আমরা শুধু জানতে চাইছি। আমরা তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। আর আমরা আপনাদের খাদ্য তালিকাতেও নেই।’ গোখরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘তোমাদের আলো আমার ভালো লাগে না। রাত অন্ধকারের জন্য। আলো দেখলেই আমার বিরক্তি লাগে। তোমাদের মৃদু আলোতেও আমাদের অনেক শিকার হাত ছাড়া হয়।’
এমন সময় পাশের ডালে বসে থাকা এক বৃদ্ধ পেঁচা কথাটা শুনে ফেলল। সে বহু বছর ধরে এই ঝাউজঙ্গলে বাস করছে। সবাই তাকে জ্ঞানী বলে মানে। পেঁচা ধীরে ধীরে বলল– ‘গোখরা, আলোকে ভয় পাও নাকি?’ গোখরা অবাক হয়ে বলল– ‘আমি ভয় পাই? আমি এই জঙ্গলের সবচেয়ে সাহসী প্রাণীদের একজন!’ পেঁচা হেসে বলল– ‘তাহলে কয়েকটা ছোট্ট জোনাকের আলো তোমাকে এত রাগিয়ে দেয় কেন?’ গোখরা কোনো উত্তর দিতে পারল না। পেঁচা আবার বলল, ‘অন্ধকারে যা দেখা যায় না, সামান্য আলো তাও দেখিয়ে দেয়। আর অনেকেই সেটাই পছন্দ করে না।’ চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জোনাকরা মন দিয়ে শুনতে লাগল। পেঁচা বলল, ‘জ্ঞানও ঠিক আলোর মতো। অজ্ঞানের অন্ধকারে যারা থাকতে অভ্যস্ত, তারা সামান্য জ্ঞানকেও ভয় পায়। কারণ আলো এলে সত্যি দেখা যায়। সত্যটাকে দেখায়।’ গোখরা এবার একটু অস্বস্তি বোধ করল।
সে মনে মনে ভাবল, সত্যিই তো! জোনাকদের আলো তার কোনো ক্ষতি করে না। তবুও সে শুধু বিরক্তি আর অভ্যাসের কারণে তাদের অপছন্দ করে এসেছে। ওই আলোয় আর কী পরিমাণ শিকার হাতছাড়া হতে পারে। অনেকক্ষণ ধরে নীরব থাকার পর গোখরা ধীরে ধীরে বলল– ‘হয়তো আমি ভুল করেছি।’ জোনাকরা বিস্ময়ে একে অন্যের দিকে তাকাল। গোখরা আবার বলল, ‘তোমাদের আলো নিভিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝছি, আলোকে আঘাত করলে অন্ধকারই শুধু বাড়ে।’ ছোট্ট জোনাকটি মুচকি হেসে উঠল। সেই রাতের পর আর কোনো সাপ জোনাকদের বিরক্ত করে না।
বরং ঝাউ-জঙ্গলের গভীর অন্ধকারে যখন শত শত জোনাক একসঙ্গে আলো জ্বালাত, তখন অনেক প্রাণী পথ খুঁজে পেত। আর বৃদ্ধ পেঁচা দূর থেকে দেখে মনে মনে বলত, ‘জ্ঞান যত ছোটই হোক, তার আলো অজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অন্ধকারকেও একদিন না একদিন দূর করবেই।’





















































