নিজস্ব প্রতিবেদক >>
রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার সকালেই ফের ডুবে যায় নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিভিন্ন নালার পানি চলাচলের স্থানে বাধা থাকায় বর্ষণে পানি নামতে পারেনি। ফলে সড়ক-নালা একাকার হয়ে পড়ে ।
কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে আটকে যায় জনজীবন; অফিসগামী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে যান চলাচল কম থাকায় গন্তব্যে ফিরতে বাড়তি খরচ গুনতে হয়।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, মাত্র তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যেন ভেসে গেছে নগর। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়ার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এটি অতি ভারী বর্ষণ হিসেবে বিবেচিত। সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৮৯ মিলিমিটার। পরে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হিসাব করলে ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত দাঁড়ায় ২০১ মিলিমিটারে।
আবহাওয়া অফিস আরও জানায়, বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল G উপকূলীয় এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এমন বৃষ্টি মঙ্গলবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে সোমবার সকাল ১০টা থেকে জোয়ার শুরু হয়, যার ভাটা শুরু হওয়ার কথা বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে। ফলে অতি ভারী বৃষ্টির পানি নামার সময়ই জোয়ারের পানির বাধার মুখে পড়ে নগরের কিছু এলাকা ।
বৃষ্টিতে নগরের কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাদুরতলা, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ নালাপাড়া, জামালখান, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, আইস ফ্যাক্টরি রোড, বাকলিয়ার বিভিন্ন অংশ, রেয়াজউদ্দিন বাজারের তিনপুলের মাথা ও মেহেদীবাগসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
অন্যদিকে জামালখান, চকবাজার, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, পতেঙ্গার ফুলছড়িপাড়া, আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ এলাকা, মুরাদপুর ও জিইসিসহ বিভিন্ন স্থানে কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে। দোকান ও মার্কেটের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মূল সড়কগুলোতে পানি জমে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিস, স্কুল-কলেজগামী মানুষকে পানি মাড়িয়েই গন্তব্যে যেতে হয় । সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে তুলনামূলক উঁচু এলাকা হিসেবে পরিচিত জামালখান নিয়েও । সেখানে রাতভর বৃষ্টির পর হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা নুর উদ্দিন ।
আরেক বাসিন্দা তনয় বড়ুয়ার ভাষ্য, তিন ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে নালাগুলো উপচে মূল সড়কের ওপর প্রায় হাঁটু পানি জমেছে। চকবাজারেও ছিল একই চিত্র।
চক সুপার মার্কেটের নিচতলার সব দোকানে পানি ঢুকে পড়লে দোকানমালিক ও কর্মচারীরা মালামাল সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। তেলিপট্টি মোড় এলাকায় সকালেও হাঁটু পানি ছিল।
কাপাসগোলার দিকে এগোলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনে খাল ও সড়কের পানির উচ্চতা প্রায় এক হয়ে যায়। কোনটি খাল আর কোনটি সড়ক, তা বোঝার উপায় ছিল না। কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় আবারও কোমরসমান পানি জমে। সেখানকার বাসিন্দা
সাইফুল ইসলাম বলেন, রাস্তায় কোমর পানি, বাড়ির নিচে হাঁটু পানি; কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, কবে এই বিপদ থেকে নগরবাসীর মুক্তি মিলবে?
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. জোবায়ের বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিক মেয়র প্রতিদিনই ইন্নয়নের কথা বলে। তার এই ইন্নয়ন কোথায়। বিগত ১০ বছর আগে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হতো, এখনো হচ্ছে। তাহলে সরকারের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব কই? জনগণের ভোগান্তি দূর হলো কোথায়?
জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও জনজীবনের ভোগান্তি । প্রধান সড়কে পানি জমে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ায় অফিসগামী ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ পথচারীরাও বিপাকে পড়েন। পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে হয়েছে অনেককে।
এছাড়া চলমান গ্যাস সংকটের কারণে কোথাও কোথাও গণপরিবহন ও ছোট যানবাহনের সংকট তৈরি হওয়ায় যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। নিচতলার দোকান ও মার্কেটে পানি ঢুকে পণ্য সরানোর পাশাপাশি দোকান বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এবারের জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, জোয়ারও বড় কারণ হিসেবে দেখছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা বলেন, অতি ভারী বৃষ্টির সময় জোয়ার থাকায় খালগুলোর কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও খালি ছিল না।
উচ্চ জোয়ারের কারণে শহরের পানি নামতে পারেনি, ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, চকবাজার, মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় পানি উঠেছিল। পরে পানি নামতে শুরু করে । তবে দুই নম্বর গেট এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়নি বলেও জানান তিনি ।
বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়ার পরও কেন অতি ভারী বৃষ্টি হলেই শহরের সড়ক খালে পরিণত হবে – এ প্রশ্নই এখন সামনে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে গত প্রায় এক দশকে চট্টগ্রামে তিন সরকারি সংস্থার চারটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দুটি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
অন্য সাম্প্রতিক হিসাবে চার প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা এবং চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পগুলোর পেছনে ইতোমধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও নগরবাসীর জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলেনি।


















































