এই শীতে খেজুরের গুড়

আশরাফুন নুর »

এই শীতে পূর্ব দিগন্তে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে থাকে। টুপ টুপ করে ঝরে পড়ে ভোরের শিশির। ঘাসে ঘাসে শিশির বিন্দু ঝলমল করতে থাকে। গ্রামে প্রভাত আলোয় দূর থেকে ভেসে আসে জ্বাল দেওয়া খেজুর রসে লোভনীয় মিষ্টি গন্ধ। সেই খেজুরের রস থেকেই তৈরি করা গুড়।

বাংলা অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। আগুনের উত্তাপে রসকে ঘন ও শক্ত পাটালিগুড়ে পরিণত করা হয়। ধরন অনুযায়ী খেজুরের গুড়কে ঝোলা গুড়, দানা গুড়, পাটালি, চিটা গুড় ইত্যাদি ভাগে ভাগে ভাগ করা যায়।

শীতকালে খেজুরের রস ও গুড় দিয়ে পায়েস, বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন পিঠা, তালের পিঠা, খেজুর গুড়ের জিলাপি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। স্বাদ আর মানভেদে খেজুরের গুড় পাটালি, নলেন গুড়, হাজারি গুড় নামে পরিচিত।

খেজুরের রস ও আহরণ
একটি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের পূর্বে অগ্রহায়ণের শেষের দিকে গাছের কা-ের একেবারে উপরের অংশে পাতাসম্বলিত বাকলগুলি ধারালো দা দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করা হয় যাকে গাছ তোলা বলে। সাত থেকে আট দিন পরে পুনরায় পরিষ্কার করা হয়। গাছ তোলার দুই সপ্তাহের মাথায় চাঁছা অংশ কিছুটা কেটে নলি (বাঁশের নল) ও খিল লাগিয়ে এবং সম্মুখভাগে হাঁড়ি ঝুলিয়ে দিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়।

রস আহরণের সময়কালের উপর ভিত্তি করে খেজুরের রসকে জিড়ান, দোকাট এবং ঝরা এই তিনভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। প্রথম রাতের গুণে ও মানে সর্বোৎকৃষ্ট এবং পরিমাণেও সর্বোচ্চ রসকে বলা হয় ‘জিড়ান’। পরদিন বিকালে গাছের চোখ বা কাটা অংশটুকু দা এর সাহায্যে চেছে পরিষ্কার করা হয় এবং দ্বিতীয় রাত্রের নির্গত রসকে বলা হয় ‘দোকাট’। দোকাটের রস জিড়ানের মতো সুস্বাদু কিংবা মিষ্টি নয় এবং পরিমাণেও হয় কম। তৃতীয় রাতে প্রাপ্ত রসকে ‘ঝরা’ রস বলা হয়। ঝরা রস দোকাটের চেয়েও পরিমাণে কম এবং কম মিষ্টি। অনেক ক্ষেত্রে ঝরা রস টক স্বাদযুক্ত হয়। পরবর্তী তিনদিন গাছকে অবসর দেওয়া হয়। এরপর আবার নতুন করে চাঁছা (কাটা) ও রস সংগ্রহ করা হয়।

খেজুরের রস আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। আবহাওয়া শীতার্ত এবং পরিচ্ছন্ন হলে রস পরিষ্কার ও মিষ্টি হয়। মেঘলা গুমোট রাতে খেজুরের রসে টকভাব আসে। নভেম্বরের প্রথম দিকে রস আহরণ শুরু হলেও ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসে সর্বাধিক পরিমাণে পাওয়া যায়।

খেজুরের গুড়
খেজুরের রসের গুড় ছাড়া শীত মৌসুমের পিঠা খাওয়া যেন জমেই না। পুরো শীতজুড়ে গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিক এ উৎসব চলে আসছে আবহমানকাল ধরে। খেজুরের গুড় বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গুড় ছাড়া শীতকালে পিঠা-পায়েস তৈরির কথা ভাবাই যায় না। শীত আসার সাথে সাথে সারাদেশে খেজুরের গুড় তৈরির ধুম পড়ে যায়। গাছিরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে রস সংগ্রহ, রস জ্বাল ও গুড় তৈরির কাজে।

গুড় তৈরির প্রণালি
স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নতমানের খেজুরের গুড় উৎপাদনের জন্য রস সংগ্রহের পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে রস ছেঁকে চুলার ওপর বসানো লোহার বা স্টিলের কড়াইয়ে ঢালা হয়। চুলার ওপর কড়াই বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কড়াই ও চুলার মধ্যে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। আরো খেয়াল রাখতে হয় যেন চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে কড়াইয়ের রসের সাথে মিশতে না পারে। রস জ্বাল দেয়ার প্রথম অবস্থায় রসের উপরিভাগে যে গাদ ভেসে ওঠে তা দ্রুত সম্ভব ছাঁকনি বা হাতা দিয়ে ফেলে দিতে হয়। তারপর রস ঘনীভূত হলে ঘনীভূত রস হাতা দিয়ে অল্প তুলে ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলে দেখতে হয় শেষের ফোঁটার আঠালোভাব দেখা যায় কি না।

ঘনীভূত রস আঠালো বা সিরাপের মতো দেখা গেলে তা নামিয়ে সিরাপ তৈরি করতে হয়। গুড় তৈরি করতে চাইলে কড়াইয়ের ফুটন্ত ঘনীভূত রস হাতলের সাহায্যে লাগাতার নাড়তে হয় এবং চুলার তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনতে হয়। গুড় তৈরির জন্য চুলা থেকে ঘনীভূত রস নামানোর সময় নিশ্চিত করতে চাইলে হাতলের সাহায্যে এক চিমটি পরিমাণ গুড় কিছু ঠা-া পানিতে ছেড়ে দিতে হয়। গুড় দ্রুত জমাটবদ্ধ হলে বুঝতে হবে গুড় চুলা থেকে নামানোর উপযোগী হয়ে গেছে এবং চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে দ্রুত ঠা-া করতে হয়।

গুড় সংরক্ষণ
শীত মৌসুমে সংরক্ষিত গুড়ে তেমন ক্ষতি না হলেও বর্ষা মৌসুমে সংরক্ষিত গুড়ের প্রায় ৩০ ভাগই খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অর্ধেক তরল প্রকৃতির গুড় সচরাচর মাটির বড় বড় পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। মাটির পাত্রে গুড় সংরক্ষণ তুলনামূলকভাবে খরচ কম বিধায় অধিকাংশ গুড় ব্যবসায়ী মাটির পাত্রে গুড় সংরক্ষণ করে থাকেন। কোনো কোনো এলাকায় ২০ কেজি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন টিনের পাত্রে গুড় সংরক্ষণ করা হয়, তবে এই পদ্ধতি কিছুটা ব্যয়বহুল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রঙ করা মাটির পাত্রে মোম বা পলিথিন দিয়ে মুখ বন্ধ করে গুড় সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন গুড় ভালো থাকে।

খেজুর গাছ
আমাদের দেশে খেজুর গাছ রাস্তার ধারে, বাড়ির আশপাশে, জমির আইলে, পুকুরপাড়ে, রেললাইনের পাশের পরিত্যক্ত স্থানে অযত্নে-অবহেলায় জন্মাতে দেখা যায়। খেজুর গাছ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ, যা থেকে প্রতি বছর কৃষক গুড় তৈরির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। সারা দেশে বিক্ষিপ্তভাবে এই বন্য প্রজাতির গাছটির চাষ হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় খেজুরের চাষ হয়ে থাকে।

বিলুপ্তি
খেজুরের গুড় বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ এখন আর কেউ সাধারণত গাছ কাটতে সক্ষম নয়। কেননা, এই কাজে পারিশ্রমিক অত্যন্ত কম। দ্বিতীয়ত, বাড়ি ঘর তৈরির জন্য ইট ব্যবহার করা হয়, এই ইটের প্রধান পোড়ানোর উপাদান হল খেজুর গাছ দ্বারা অনেক পরিমাণে আগুন জলে যার ফলে ইটভাটায় বেশি খেজুর গাছ ব্যবহার হয়। এই কারণেই খেজুর গাছ এখন বিলুপ্তির পথে তাছাড়া ও খেজুর গাছ দিয়ে নানান কাজ করা হয়।

গুড়ের গুণ
শীতকালে পিঠাপুলি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় নলেন গুড় বা খেজুরের গুড়। শুধু স্বাদের জন্যই না, গুড়ের রয়েছে নানা স্বাস্থ্যকর গুণ। দীর্ঘ সময় ধরে আয়ুর্বেদশাস্ত্রে বিভিন্ন চিকিৎসায় গুড় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রস থেকে তৈরি এই গুড়ে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকায় এটি দেহের জন্য দারুণ উপকারী। ১০০ গ্রাম খেজুরের গুড়ে থাকে ১.৫ গ্রাম প্রোটিন, ০.৩ গ্রাম ফ্যাট, ৮৫.৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং ২.৫ গ্রাম আঁশ। এ ছাড়া এই গুড় থেকে সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, কপার ও ক্লোরাইড পাওয়া যায়।

গুড়ের উপকারিতা
ক. গুড়ে পর্যাপ্ত আয়রন আছে। এটি রক্তস্বল্পতা রোধে সাহায্য করে। খ. উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে গুড় খেতে পারেন। নিয়মিত গুড় খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। গ. শরীরের ভেতর থেকে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ও চুল ভালো রাখতে সাহায্য করে গুড়। ঘ. হজমপ্রক্রিয়া উন্নতি করতে গুড় সাহায্য করে। ঙ. লিভার পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। চ. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ছ. দেহের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। জ. গুড়ের আছে রক্ত পরিশোধনক্ষমতা। রক্ত পরিষ্কার থাকলে কমে অনেক রোগের ঝুঁকি। ঝ. অ্যান্টিটক্সিক বা শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করতে সাহায্য করে। ঞ. মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে গুড় উপকারী। এটি নিয়মিত সেবনে স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে। ট. এর আছে অ্যান্টিকার্সিনোজেনিক বৈশিষ্ট্য, যা ক্যানসারবিরোধী উপাদান হিসেবে কাজ করে। ঠ. গুড় খেলে চোখের দুর্বলতা দূর হয়। শুধু তা–ই নয়, গুড় দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক।