নুরুল ইসলাম বাবুল »
ডুয়ার্সে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয়েছিল, প্রকৃতি যেন এখানে অন্য এক ভাষায় কথা বলে। দূরে নীলচে পাহাড়, দু পাশে চা-বাগানের অন্তহীন সবুজ, মাঝেমধ্যে শাল-সেগুনের জঙ্গল, আর বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। কলকাতার ব্যস্ত জীবন থেকে তিন দিনের ছুটিতে এখানে এসেছিলাম শুধু একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য।
সন্ধ্যার পর রিসোর্টের কেয়ারটেকার বললেন, আজ পূর্ণিমা। চাইলে জঙ্গলের ধারের নদী পর্যন্ত হাঁটতে যেতে পারেন। তবে রাত বেশি করবেন না। মাঝে মাঝে হাতি বেরোয়।
হাতির কথা শুনে ভয়ও লাগল, আবার কৌতূহলও জাগলো।
রাত সাড়ে নয়টার দিকে টর্চ হাতে বেরিয়ে পড়লাম। চারদিকে কুয়াশা নেমেছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কোথাও অজানা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি গাছের আড়ালে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ শুনলাম একটি মেয়ের কণ্ঠ।
একটু শুনবেন?
চমকে পেছনে তাকাতেই দেখলাম, লাল শাল জড়িয়ে এক তরুণী দাঁড়িয়ে। বয়স সাতাশ-আটাশ হবে। মুখে একরাশ উদ্বেগ।
আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমার কটেজটা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি বললাম, আমি নিজেও নতুন। তবে চলুন, একসঙ্গে খুঁজে দেখি।
নিজের নাম বলল, ঈশিতা। সে নাকি একাই ঘুরতে এসেছে। কথাবার্তায় বোঝা গেল, বই পড়তে ভালোবাসে, শহরের কোলাহল থেকে পালিয়েই ডুয়ার্সে এসেছে।
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম।
কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। হঠাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে ডাল ভাঙার বিকট শব্দ।
ঈশিতা আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
ওটা কী?
আমি ফিসফিস করে বললাম, হয়তো… হাতি।
ঠিক তখনই দূরে কয়েকটি আলো জ্বলে উঠল। বনরক্ষীদের জিপ।
একজন চিৎকার করে বললেন, ওইদিকে যাবেন না। হাতির পাল রাস্তা পার হচ্ছে!
আমরা দ্রুত রাস্তার ধারের একটি উঁচু ওয়াচ টাওয়ারে উঠে গেলাম।
তারপর যা দেখলাম, তা জীবনে ভোলার নয়।
পূর্ণিমার আলোয় বিশাল এক হাতির পাল ধীরে ধীরে রাস্তা পার হচ্ছে। ছোট্ট হাতিশাবক মায়ের শরীর ঘেঁষে হাঁটছে। চারদিকে এমন নীরবতা, যেন প্রকৃতিও নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।
ঈশিতা অজান্তেই আমার কাঁধে মাথা রাখল।
সে খুব আস্তে বলল, জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কাউকে না পেলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমি উত্তর দিলাম না।
শুধু অনুভব করলাম, তার কাঁপতে থাকা হাতটা এখনও আমার হাতেই ধরা। প্রায় আধঘণ্টা পর বনরক্ষীরা আমাদের নিরাপদে রিসোর্টের দিকে নিয়ে এলেন।
ফেরার পথে ঈশিতা হেসে বলল, আজ যদি আমি পথ না হারাতাম, তাহলে তোমার সঙ্গে দেখা হতো?
আমি বললাম, হয়তো না।
সে আবার বলল, তাহলে মাঝে মাঝে পথ হারানোও ভালো।
রিসোর্টের সামনে এসে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বিদায়ের আগে সে বলল, কাল সকালেই আমার ট্রেন।
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা নেমে এল।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই দৌড়ে তার কটেজে গেলাম।
দরজায় তালা।
রিসেপশনে জানতে পারলাম, সে সূর্য ওঠার আগেই চলে গেছে।
শুধু আমার নামে একটি ছোট্ট খাম রেখে গেছে।
ভেতরে একটি শুকনো শিউলি ফুল আর একটি চিরকুট।
তাতে লেখা-
সব প্রেমের শেষ একসঙ্গে থাকা নয়। কিছু প্রেমের কাজ শুধু একটি রাতকে সারাজীবনের স্মৃতি বানিয়ে দেওয়া। যদি কোনোদিন আবার ডুয়ার্সে আসো, পূর্ণিমার রাতে সেই ওয়াচ টাওয়ারে পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকো। হয়তো দেখা হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু আজকের রাতটা তখনও সত্যি থাকবে। চিরকুটটি বুকপকেটে রেখে আবার একবার জঙ্গলের দিকে তাকালাম। কুয়াশা তখনও ভাসছে।
মনে হচ্ছিল, রাতের সেই পথ, হাতির পাল, পূর্ণিমার আলো আর ঈশিতার মৃদু হাসি সবই যেন বাস্তব, আবার স্বপ্নও।
আজ বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখনও ডুয়ার্সে যাই।
পূর্ণিমার রাতে সেই ওয়াচ টাওয়ারে পাঁচ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি।
প্রতিবারই মনে হয়, কুয়াশার আড়াল থেকে লাল শাল জড়িয়ে কেউ একজন হয়তো এগিয়ে আসছে, মৃদু হেসে বলছে-
একটু শুনবেন… আমি আবার পথ হারিয়ে ফেলেছি।
মির্জা গালিব স্ট্রিট। কলকাতা – ৭০০০১৬।






















































