মতামত সম্পাদকীয়

গুলিয়াখালী সৈকতকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব কার

সবুজ ঘাসের চাদর, আঁকাবাঁকা মাটির ভাঁজে জমে থাকা জোয়ারের পানি আর অনন্য ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল—প্রকৃতির এই রূপবৈচিত্র্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকতকে অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অপরূপ সৌন্দর্যের এই লীলাভূমি এখন ক্রমশ পর্যটকদের জন্য মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন বছরে এই সৈকতে সাগরে ডুবে চারজন পর্যটকের অকালমৃত্যু হয়েছে এবং সাঁতার কাটতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন ২০ জনেরও বেশি মানুষ। এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং দেশের পর্যটন খাতের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
গুলিয়াখালী সৈকতের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য কক্সবাজার বা কুয়াকাটার মতো প্রথাগত সৈকত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর তলদেশ এবড়োখেবড়ো এবং জোয়ার-ভাটার স্রোত অত্যন্ত তীব্র। কিন্তু এই প্রাকৃতিক ঝুঁকির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে কিছু মানবসৃষ্ট কারণ। স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, বাঁশবাড়িয়া ও সংলগ্ন সৈকত এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ভাটার সময় যখন পানি নেমে যায়, তখন এই গর্তগুলোতে মারাত্মক ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়, যা যেকোনো সাঁতারুর জন্যও ধারণার অতীত বিপজ্জনক। লোভের বশে পরিবেশ ও মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে এই বালু উত্তোলন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
দুর্ঘটনা বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো পর্যটকদের অসচেতনতা। বিশেষ করে ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাগরের গভীরে চলে যাওয়ার এক ধরনের হঠকারী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাঁতার না জেনে কিংবা সাগরের জোয়ার-ভাটার রূপ না বুঝে অবলীলায় পানিতে নেমে যাওয়ার কারণেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে কেবল পর্যটকদের দোষ দিয়ে প্রশাসনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এলাকাটিকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করার চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পুরোপুরি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, যা স্থানীয় প্রশাসনের এক ধরনের ব্যর্থতা ও সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে লাল পতাকা ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টাঙানো এবং গ্রাম পুলিশ মোতায়েনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় একেবারেই অপ্রতুল। গুলিয়াখালী সৈকতকে নিরাপদ করতে হলে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সৈকত এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে সব ধরনের অবৈধ বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ এবং চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কেবল গ্রাম পুলিশ দিয়ে এত বিশাল সৈকতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। এখানে স্থায়ীভাবে দক্ষ লাইফগার্ড এবং ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ’ মোতায়েন করতে হবে, যারা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবেন। পাশাপাশি, সৈকতের প্রবেশমুখেই পর্যটকদের জন্য জোয়ার-ভাটার সঠিক সময়সূচি প্রদর্শন এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।
পর্যটন একটি দেশের অর্থনীতি ও বিনোদনের অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই বিনোদন যেন কোনো পরিবারের জন্য আজীবনের কান্না হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও প্রশাসনের। আমরা আশা করি, আর একটি প্রাণও যেন গুলিয়াখালীর ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে না যায়। প্রশাসন ও পর্যটকদের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে এই সুন্দর সৈকতটিকে একটি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে।