মতামত সম্পাদকীয়

বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর ধরন : জীবনরক্ষায় সমন্বিত প্রতিকার চাই

দেশের মানুষের দুর্দশার যেন শেষ নেই। যেমন ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন আর কেবল বর্ষাকালের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মশার ধরন পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু তার রূপ বদলে আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সরকারি স্বাস্থ্য তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭,৪০৯ জন রোগী এবং প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৫৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ও অকাল মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট বার্তা দেয়—প্রথাগত উপায়ে ডেঙ্গু মোকাবিলা করার সময় পেরিয়ে গেছে।
চিকিৎসকদের অভিমত, ডেঙ্গুর ক্লাসিক্যাল লক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অতীতে যেমন উচ্চ জ্বরের সাথে শরীরে তীব্র ব্যথার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যেত, এখন অনেক সময় মৃদু জ্বর কিংবা কেবল পেটের সমস্যা ও বমির উপসর্গ নিয়েই রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’-এ আক্রান্ত হচ্ছেন অতি দ্রুত। রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া বা শরীরের ভেতরের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এই পরিবর্তিত লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও রোগীদের সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত করছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে।
এই ভয়াবহ রূপান্তর থেকে রক্ষা পেতে হলে ব্যক্তি সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার ব্যবস্থার সমন্বয় জরুরি। প্রথমত, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কোনো বিকল্প নেই। বাসা-বাড়ি, ছাদবাগান, নির্মাণাধীন ভবন বা সংলগ্ন পাত্রে পানি তিন দিনের বেশি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে শুধু লার্ভিসাইড স্প্রে কিংবা ধোঁয়া দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধারাবাহিক মশক নিধন অভিযান চালাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ডেঙ্গু লক্ষণের পরিবর্তন হওয়ায় জ্বর অনুভব করার সাথে সাথেই চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। ঘরে বসে নিজে নিজে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা সঠিক সময়ে হাসপাতালে না যাওয়ার প্রবণতাই মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক মৌসুমি রোগ নয়, এটি একটি স্থায়ী নগর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে কার্যকর গবেষণা, বছরব্যাপী মশক নিধন কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য খাতের দ্রুত প্রস্তুতিই পারে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করতে। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতাই এখন ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সে জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা তৈরি করা। ঘরে ঘরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

---------