অবহেলাও একটি কারণ
সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২ হাজার ২৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২৪টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। ৫০০টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০-এর কম। এছাড়া শিক্ষক ও প্রশাসনিক জনবলের অভাব, ১৮টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকা এবং নগর এলাকার অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যাক বিদ্যালয়সহ মোট ৫০০টি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকার তথ্য শিক্ষার গুণগত মান ও অবকাঠামোগত বেহাল চিত্রকেই সামনে এনেছে।
একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা হলো জাতির সার্বিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি। কিন্তু চট্টগ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। যখন শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছায় এবং প্রধান শিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত নেতৃত্বের পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকে, তখন সেখানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ আশা করা অসম্ভব। শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে। ফলে অভিভাবকেরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এবং বিকল্প হিসেবে বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের দিকে ঝুঁকছেন, যা দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
কেবল শিক্ষক সংকটই নয়, মৌলিক অবকাঠামোগত ঘাটতিও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বড় বাধা। একুশ শতকে এসেও একটি প্রধান জেলার ১৮টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের অভিযাত্রায় যেখানে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ছোঁয়া দেওয়ার কথা, সেখানে বিদ্যুৎই নেই। আবার নগর এলাকার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও ৫০০টি বিদ্যালয়ে মাঠের অনুপস্থিতি শিশুশিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। মাঠহীন ছাদ কিংবা অন্ধকার ঘরে শৈশবের বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শূন্য থাকা ৮২৪টি প্রধান শিক্ষকের পদসহ অন্যান্য সকল শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, জরুরি ভিত্তিতে সেখানে বিদ্যুৎ সুবিধা ও আধুনিক শিখন সামগ্রী পৌঁছানো দরকার। নগর এলাকার বিদ্যালয়গুলোর জন্য অন্তত নিকটস্থ খেলার মাঠ বা পার্ক ব্যবহারের উদ্যোগ বা বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো যদি শুধু কাগজে-কলমে অবকাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ভেতরে শিক্ষার আলো ও খেলার আনন্দ না থাকে, তবে শিক্ষার্থী হ্রাস থামানো যাবে না। প্রাথমিক শিক্ষাকে বাঁচাতে চট্টগ্রামের এই সংকটগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও যথাযথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।




















































