ফিচার শিল্প-সাহিত্য

পোড়া বাড়ি

অলোক আচার্য »

মেয়েটি পায়ে আলতা দিয়েছে। এই যুগে কেউ আলতা দেয় আমি জানতামই না। শহরের খাঁচাময় জীবনের কারণে গ্রামের অনেক সংস্কৃতিই আমি ঠিকঠাক জানি না। মা’র মুখে গল্প শুনেছি, এক সময় মা-খালারা আলতা পরতেন খুব ঘটা করে। পরিবারের কয়েকজন একসাথে হয়ে আলতা পরতেন। সুলেখার পায়ে আলতা দেখে সেই কথা মনে পরলো। মেয়েটার পায়ে নুপূরও আছে মনে হয়। যদিও গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা। শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি এই হঠাৎ পরিচয় হওয়া পরিবারটি আতিথেয়তায় মুগ্ধ হতে আরম্ভ করেছি। গ্রাম্য পরিবেশে এত ভদ্র আচরণ সত্যি আশাতীত। আমি যেমন কাউকে চিনি না আবার আমাকেও কেউ চেনে না। আমার রেফারেন্সে এই পরিবারের কর্তা যাদের চিনেছেন, সেটা আমাকে থাকতে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এই যুগে অপরিচিত মানুষকে রাত্রি যাপন করতে দেওয়ার ঝুঁকি আজকাল আর যেচে কেউ নিতে চান না। যদিও অতিথিকে সেবা করা মহা পূণ্যের কাজ। আজকাল সেসব পূণ্যের কাজ-টাজ আর কেউ করে না। অধিকাংশই তো ভদ্রবেশী চোর-ছ্যাচড়! ডাকাত-ফাকাতের ঝুঁকিও আছে! কে আর যেচে এত ঝুঁকি নেয়! কিন্তু বেচারা টাইপের ভজন ব্যাপারীর চোখে-মুখে অতটা ইতস্তত ভাব আমি দেখিনি। যেটুকু ইতস্তত ভাব ছিল সেটুকু অন্য কারণে। পরে বুঝেছি।
আমি আগে কোনোদিন গ্রামের পথে আসিনি। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলাম। কয়েক বছর ঢাকা এসে ব্যবসা শুরু করেছি। পরিবারও সেখানে। কোনো পার্বণে পরিবার গ্রামে এলেও আমার আর আসা হয়ে ওঠে না। ফলে গ্রামের রাস্তাঘাট আমার কাছে অনেকটা অচেনা। আমার এক যুগ আগে দেখে যাওয়া গ্রাম যে আর গ্রাম নেই, মাঠগুলো সব আস্তে ধীরে মানুষের দখলে ইটের প্রাচীরে ঢেকে গেছে সে খোঁজ আমার খুব একটা জানা নেই। মাঝে মধ্যে পেপার পত্রিকায় পড়ি অবশ্য। তাতে আর কতটুকু জানা যায়। এবার যখন আমার টাইফয়েড হলো, বেশ কড়া টাইফয়েড, মানে যমে মানুষে টানাটানি আরকি। আমি মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। কিন্তু আমার মনের অসুখ আর কমে না। সারাক্ষণ কেমন যেন মন খারাপ ভাব লেগে থাকে। ততদিনে ব্যবসাটা লাটে ওঠার জোগার। ডাক্তার আর বউ পরামর্শ করে আমাকে গ্রাম থেকে ঘুরে আসতে বললো। আমি ভেবে দেখলাম, আমার একটু ঘুরে-টুরে আসাই ভালো। তাতে মনটার যদি একটু উন্নতি হয়। শরীরটাও গ্রামের ফ্রেশ অক্সিজেন পেয়ে তরতাজা হবে। ছেলেমেয়েদের স্কুল আর কোচিংয়ের কারণে আমাকে একাই যেতে হবে। দুপুরের পর চেপে বসলাম ট্রেনে। ও বাবা, পথে ট্রেন দুই ঘন্টা লেট। এদিকে আমি তেমন কাউকে চিনিও না। কারণ গ্রামের বাড়িতে আমার নিজের বলতে দুর সম্পর্কের চাচা পরিবার নিয়ে থাকে। আমাদের কিছু জমি-টমি দেখাশোনা করে। পুকুর আছে আমাদের সেসবও দেখেন। বছরান্তে বড় বড় মাছ আর ধান নিয়ে দিয়ে আসে। আমরাও এদিকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। বিক্রির কথা উঠলেই কেঁদেটেদে একাকার অবস্থা করে ছাড়েন। আমার মায়া লাগে। বউয়ের কড়া চোখ উপেক্ষা করে বলি, থাক না, কী দরকার বেচে! কয়েকটা প্রাণ তো বেঁচে থাকছে। বউয়ের যুক্তি উল্টা। বাস্তববাদী। বিক্রি করলে যে টাকা পাবো সেটা দিয়ে একটা কমের মধ্যে ফ্ল্যাট হয়ে যাওয়ার কথা। আমি তর্কে যাই না। এভাবেই জমিগুলো টিকে আছে। সেই চাচার বাড়িতেই আমাকে কয়েকটা দিন থাকতে হবে। মোবাইলে কথা হয়েছে। ট্রেনটা নষ্ট না হলে আমার দেরী হতো না। ঠিকঠাক সময়েই পৌছে যেতাম। চাচা আগেই বলেছিল রাত দশটার পর আর গ্রামে আসার রিকশা-ভ্যান কিছুই পাওয়া যাবে না। অথচ আমার পৌছাতে পৌছাতে বেজে গেলো এগারোটা। নেমে দেখি দু’টা দোকান বন্ধ। খোলা থাকার আশা করাই বৃথা। এদিকে শেষ মাঘের কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়েছে। রাস্তার দু’পাশে ধানি জমিগুলো আমার ধারণাকে পরিহাস্য করছে। আমি নাক-মুখ ঢেকে ভাবছি এবার কী করবো? মোবাইলে নেটওয়ার্কটাও যাচ্ছেতাই অবস্থা! ভাঙা ভাঙা কথায় যা বুঝলাম, আপাতত যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এখান থেকে মাইল পাঁচেক হবে। নিজের দু’খানা পা ছাড়া বিকল্প নেই! ভাবা যায়! আমাকে এখন পাঁচ মাইল হাঁটতে হবে! কিন্তু এখানে বসে থেকে তো কোনো লাভ নেই। অতএব, পছন্দ না হলেও আমি পা চালাতে শুরু করি! মাঘের শীত যেন অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে দিয়েছে। পকেট থেকে মোবাইল জ্বালিয়ে রাস্তা বের করি। খুব লাভ হয় না। কুয়াশায় এ আলো কেবল সামনের পা টুকু ফেলার সাহস জোগায়। হাঁটতে হাঁটতে হয়তো মাইল খানেক চলে আসি। একই দৃশ্য গ্রামের। মাঝে মাঝে ঘরবাড়ি, আবার মাঠ। কোথাও দু’চারটা দোকান দেখেছি। ভিতরে হয়তো মানুষ আছে। আমি কান পেতে শব্দ শোনার চেষ্টা করেছিলাম। ঠিক হিসেব নেই, খুব সিগারেটের নেশা পাওয়ায় আমি একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। ক্লান্তিটা দূর করা দরকার। শীতে আমার হাত জমে গেছে। আগুনের হালকা আঁচে যেন হাত আবার শক্তি পায়। আমি সামনের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছি আর ডাক্তারের উপর বিরক্ত হচ্ছি। অসুস্থ শরীর এখনও ঠিকমতো সায় দেয় না। সেই শরীরে আমি হাঁটছি এতটা পথ! রাগে ফোন বন্ধ করে দিয়েছি। বউটা যাতে যোগাযোগ না করতে পারে। ঠিক এই সময় আমার কাঁধে যেন কেউ হাত রাখলো! আমি ভয়ে তিন হাত পিছনে সরে যাই। জোরে চিৎকার করে উঠি। কে, কে?
আমি। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে মনে হলো আপাদমস্তক চাঁদরে জড়ানো কেউ দাঁড়িয়ে আছে আমার থেকে তিনহাত দুরত্বে।
ভাইজান কি ভয় পাইলেন নাকি?
আমার হাতের সিগারেট পরে গেছে। কে আপনি?
ভয় পাবেন না, ভাইজান। আমি ভজন ব্যাপারি। ভূত-টুত নই! তা এত রাতে ভাইজান যে এইখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন! আপনি যাবেন কোথায়?
এখন আমি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছি। অন্তত মানুষ তো! তার আগে আপনি বলেন, এত রাতে আপনি এখানে কী করেন?
এ কথা শুনেই তিনি হেসে ওঠেন। ভাইজান মনে হয় লক্ষ্য করেননি, পিছনেই আমার বাড়ি।
এবার আমি পিছনে তাকাই। সত্যিই তো একটা বাড়ি। আশেপাশে আর কোনো বাড়ি নেই। তা না থাকুক। কিন্তু এতক্ষণ সে বাড়িটাকে দেখেনি কেন? এত অন্ধকারে হয়তো বুঝতে পারেনি। চারদিকে যে কুয়াশা পড়েছে!
ভাই আপনি যাবেন কোথায়?
উত্তর পাড়ার মন্তাজ মিয়ার বাড়ি। আমার চাচা।
এখনও তো ম্যালা দূরের পথ! এত পথ হাঁটতে পারবেন না। আর রাস্তার অবস্থাও ভালো না।
কিন্তু আপনি কে?
আমি ভজন ব্যাপারি। কিছু মনে না করলে আপনি বাকি রাতটুকু আমার বাড়িতে অতিথি হতে পারেন। এই শীতের রাতে আপনার অসুখ-বিসুখও হতে পারে। আর তাছাড়া আপনি বিপদে পরতে পারেন। গ্রামের পথÑঘাট সব সময় ভালো হয় না। মানুষ না থাকলেও অন্য কিছু আছে।
অন্য কিছু মানে?
সে না বলি। চলেন ভাই, আর ইতস্তত করবেন না। আমার বাড়িতে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। একটা রাতই তো।
লোকটির জোড়াজুড়ি আর আমার এই কাহিল অবস্থা! আমি ভাবি সত্যি তো, এত রাস্তা আমি হাঁটতে পারবো না। শীতে আমার শরীর অসাড় হয়ে আসছে। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা। একটু গরম না পেলে যেন আর বাঁচা যাবে না। আমি তাই আর দ্বিমত না করে লোকটার বাড়িতে অতিথি হই। ছিমছাম বাড়ি। চৌচালা টিনের ঘর। তাতে কয়েকটা রুম করা। আমাকে একটা রুমে নিয়ে বসানো হলো। কিছুক্ষণ পর ব্যাপারি সাহেব এলেন। সাথে দুইজন নারী। পরিচয় পর্ব থেকে জানলাম একজন তার স্ত্রী আর অন্যজন মেয়ে। মেয়েটার দিক থেকে চোখ ফেরানো যায় না। বছর চৌদ্দ কি পনেরো হবে। নাম সুলেখা। আমি আসার পর থেকে গরম পানি এগিয়ে দেয়া, আমার প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দেয়া সব কাজই মেয়েটা করছে। নুপূরের শব্দ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে। আমি যা-ই জিজ্ঞ্যেস করছি, সুলেখা শুধু হু হা বা মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিচ্ছে। রাতের খাওয়ার পর্ব শেষে কম্বলের নিচে যখন ঘুমাতে গেলাম, মনে হলো জানটা ভজন বাবুর দয়ায় বেঁচে গেলো। আমি শেষ রাতে উঠি। আর কতক্ষণ ভজন বাবুর আতিথেয়তায় থাকবো। আমি ওঠার আগেই দেখি ভজন বাবু উঠেছেন। আর কাউকে দেখলাম না। বিনয় বশত সকালে নাস্তা করে তারপর যেতে বললেন। আমিই তাড়া দেখালাম। রাতে চাচার বাড়ি পৌছাতে না পারার কারণে এমনিতেই সকলে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। তাছাড়া অপরিচিত এই মানুষগুলোকে আর অহেতুক বিরক্ত করতে ইচ্ছা করলো না। আমি ভজন বাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। যেতে যেতে বুঝলাম কেন ভজন বাবু অত রাতে আমাকে আটকেছিলেন। ভাগ্যিস থেকে গিয়েছিলাম! পৌছাতে পৌছাতে বেশ বেলা হয়ে গেলো। আমাকে দেখেই চাচা নানা প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমি ভজন ব্যাপারির নাম বলতেই চাচা চোখ মুখ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, কার বাড়িতে ছিলে বলছো, বাবা? ভজন ব্যাপারি? বলো কি! উনি বেশ অবাক হওয়ার মতো করলেন। আমি ঠিক কারণটা বুঝতে পারলাম না। তাই জিজ্ঞ্যেস করলাম, কেন চাচা কী হয়েছে? মানুষটা তো বেশ ভালো মনে হলো। আমাকে খাতির যত্ন করলেন। অন্তত রাতটুকু তো আশ্রয় দিয়েছেন। এবার চাচা চিন্তিত মুখে বললেন,সে তো ঠিক আছে। আমি ঐ জায়গায় যে ভজন ব্যাপারিকে চিনি তিনি তো মানে তার পরিবারই তো নেই!
নেই মানে?
নেই মানে, মাস কয়েক আগে ওদের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছিল। মাঠের পাশে ফাঁকা জায়গায় বাড়ি। কেউ টেরও পায়নি। ডাকাতরা যাওয়ার আগে সবাইকে ঘরে আটকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। সেই মামলা এখনও চলছে। এরপর থেকে ওদিকে কেউ দাঁড়াতে সাহস করে না। অনেকেই যেতে আসতে গভীর রাতে ঐ জায়গায় আলো জ্বলতে দেখেছে। আবার কেউ কেউ শুনেছে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার। এটা নিয়ে গ্রামের মানুষ খুব দুশ্চিন্তায় আছে। আমি পরীক্ষা করার জন্য দুপুরের পর চাচাকে নিয়ে বের হলাম। কিসের বাড়ি! কেউ নেই! পোড়া ইট-কাঠ এখনও চাচার কথার সত্যতার স্বাক্ষী দিচ্ছে। ফিরে আসছিলাম। হঠাৎ মনে হলো নুপূরের শব্দ বাজছে। কাল রাতেও শুনেছিলাম এই শব্দ। সুলেখার পায়ে ছিল।

---------