বিজনেস

নতুন পান বরজে স্বপ্ন বুনছেন মহেশখালীর চাষিরা

মোস্তফা সাদিক রিজভী, মহেশখালী >>

জ্যৈষ্ঠের খরতাপ পেরিয়ে বর্ষার মেঘ যখন মহেশখালীর আকাশে জমতে শুরু করে, তখনই ব্যস্ততা বেড়ে যায় পানচাষিদের। পুরোনো বরজের হিসাব শেষ করে নতুন পান বরজ তৈরির প্রস্তুতিতে মাঠে নামেন তারা। কেউ জমি পরিষ্কার ও প্রস্তুত করেন, কেউ সংগ্রহ করেন বাঁশ, শন ও দড়ি, আবার কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন পানগাছের লতা ও চারা সংগ্রহে। মে থেকে সেপ্টেম্বর—বাংলা মাসের হিসাবে জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন—সময়টিই অনেক চাষির কাছে নতুন স্বপ্ন বোনার মৌসুম।

---------

চাষিরা জানান, নতুন পান বরজ তৈরি সহজ কোনো কাজ নয়। প্রথমে জমি পরিষ্কার করে মাটি প্রস্তুত করতে হয়। এরপর বাঁশের খুঁটি, শন, দড়ি ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয় বরজের কাঠামো। পানগাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে আলো, বাতাস ও ছায়ার সঠিক ভারসাম্য প্রয়োজন। অতিরিক্ত রোদ, ভারী বৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতা হলে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কৃষকেরা।

জানা যায়, মহেশখালীর সমতল জমিতে সাধারণত মৌসুমি এবং পাহাড়ি ঢালু জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে পান চাষ করা হয়। উপজেলার বড় মহেশখালী, হোয়ানক, কালারমারছড়া, ছোট মহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নের পাহাড়ি ঢাল এবং কৃষিজমিতে ব্যাপকভাবে পান চাষ হয়ে আসছে।

কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মহেশখালীতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। এ সময় প্রায় ২০ হাজার বরজে যুক্ত ছিলেন ২৮ হাজারের বেশি চাষি। ফলে পান শুধু একটি ফসল নয়, এটি হাজারো পরিবারের জীবিকার অন্যতম উৎস।

চাষিরা জানান, একটি নতুন পান বরজ তৈরিতে জমি প্রস্তুত, বাঁশ, শন, দড়ি, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। ২০-২৫ শতক জমির একটি বরজ তৈরিতে খরচ হতে পারে লক্ষাধিক টাকা। তবে ভালো ফলন ও বাজারদর পেলে পান চাষ থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।

অভিজ্ঞ চাষিরা জানান, পান চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্ষার পানি পানগাছের জন্য প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বরজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ ও জুনের শুরুতে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মহেশখালীর প্রায় ৫০০ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ কারণে নতুন বরজ তৈরির সময় কৃষকদের একদিকে বৃষ্টির প্রত্যাশা, অন্যদিকে অতিবৃষ্টির ভয় নিয়ে কাজ করতে হয়।

বরজে পান বড় হতে শুরু করলে শুরু হয় আরেক ব্যস্ততা। নিয়মিত পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও পাতা সংগ্রহের কাজ করতে হয় কৃষকদের। স্থানীয় বাজারে বিক্রির পর এসব পান গোরকঘাটা, বড় মহেশখালী নতুন বাজার, হোয়ানক, কালারমারছড়া ও শাপলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। মহেশখালীর মিষ্টি পানের চাহিদা দেশের বাইরেও রয়েছে।

চাষিদের দাবি, পান বিক্রি করে ভালো আয় হলেও বাজারদরের ওঠানামা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যায় না। তাই ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনে কৃষি বিভাগের সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বরজের জন্য সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল গাফ্ফার বলেন, “পান চাষ মহেশখালীর কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক ও ঐতিহ্যবাহী কৃষি। সঠিকভাবে বরজের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদন ও আয় দুটোই বাড়ানো সম্ভব। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।”

জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন—এই কয়েক মাস মহেশখালীর পানচাষিদের কাছে শুধু নতুন বরজ তৈরির সময় নয়, বরং নতুন আশা ও জীবিকার স্বপ্ন বোনার সময়। সবুজ পানের পাতায় ঘেরা প্রতিটি বরজে যেন লুকিয়ে থাকে কৃষকের ভবিষ্যতের গল্প।