বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

কামরুল হাসান বাদলের খুন ও হুইসেল

হুইসেলের শব্দে জেগে ওঠা সমাজ

আসমাউল হুসনা নিব »

কিছু গল্প ঘটনা বলে শেষ হয়ে যায়, আর কিছু গল্প শেষ হওয়ার পর পাঠকের ভেতরে নতুন করে শুরু হয়। কামরুল হাসান বাদলের খুন ও হুইসেল দ্বিতীয় ধরনের গল্পের বই। এর নয়টি গল্পের শরীর আলাদা হলেও রক্তপ্রবাহটি এক মানুষের অসহায়তা, সমাজের ক্ষয়, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার অদৃশ্য হাত এবং অন্ধকারের মাঝেও বেঁচে থাকা মানবিক বিবেক।
বইটির নামেই রয়েছে অসাধারণ একটি সংঘর্ষ। ‘খুন’ চূড়ান্ত সহিংসতার শব্দ; ‘হুইসেল’ সতর্কতা, প্রতিবাদ কিংবা অপরাধ দেখে চুপ না থাকার সংকেত। একটি শব্দ মৃত্যু ঘটায়, অন্যটি মানুষকে জাগাতে চায়। এই দুই বিপরীত শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে লেখক যেন বইটির নৈতিক অবস্থান আগেই জানিয়ে দিয়েছেন অন্ধকার তিনি দেখাবেন, কিন্তু সেই অন্ধকারের সামনে নীরব থাকবেন না।
কামরুল হাসান বাদলের গল্পকার-সত্তার ভেতরে কবি ও সাংবাদিক পরস্পরের হাত ধরে চলেছেন। কবি তাঁকে দিয়েছেন রহস্য, প্রতীক, বিষণ্ণতা ও দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতা; সাংবাদিক দিয়েছেন সমাজকে কাছ থেকে দেখার তীক্ষ্ণ চোখ। ফলে তাঁর গল্প নিছক সংবাদ হয়ে যায় না, আবার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কল্পলোকেও হারিয়ে যায় না। বাস্তব ঘটনা তাঁর হাতে মানুষের অন্তর্গত সত্যে রূপ নেয়।
সংকলনের প্রথম গল্প ‘যে রাতে আমি মদ্যপান করিনি’ এই বৈশিষ্ট্যের চমৎকার পরিচয়। একাকী সাংবাদিক-কথক, অস্বাভাবিক ট্যাক্সিযাত্রা, কবরস্থান, কবর থেকে উঠে আসা মানুষ এবং রাতের নীরবতা, সবকিছু মিলিয়ে গল্পটি প্রথমে অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা বলে মনে হয়। কিন্তু শামসের নামের পুলিশ সদস্যের আগমন এবং ঘরের ভেতরের ছিটকিনি নিয়ে শেষ প্রশ্নটি বাস্তব ও বিভ্রমের সীমা আরও অস্পষ্ট করে দেয়। গল্পটি একই সঙ্গে ভয়ের, কৌতুকের, নিঃসঙ্গতার এবং ক্ষমতাকে নিয়ে সূক্ষ্ম বিদ্রূপের। সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো লেখক রহস্যের সমাধান দেন না; পাঠককে নিজের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একা রেখে দেন।
‘আবুল সওদাগর’-এ বড় কোনো রাষ্ট্রীয় ঘটনার বদলে একটি পরিবারের সকালের দৃশ্যেই ক্ষমতার নির্মম মুখ দেখা যায়। আবুলের রূঢ় ভাষা ও কর্তৃত্বের পাশে কোহিনুর বেগমের প্রতিবাদ ছোট হলেও গভীরভাবে মানবিক। সংসারের ভেতরের অপমান, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, প্রজন্মের দূরত্ব এবং সম্পর্কের অস্বস্তি এখানে একই টেবিলে এসে বসে। একজন সাধারণ নারীকে নীরব পার্শ্বচরিত্র না বানিয়ে তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াই গল্পকারের মানবিক সংবেদনশীলতার পরিচয়।
‘রাজ্জাক-কবরীর শেষ অধ্যায়’ বইটির কোমল অথচ বিষণ্ণ পরিসর। মরিয়ম ও রেজাউলের সম্পর্কের পাশে রাজ্জাক-কবরী নাম দুটি কেবল চলচ্চিত্রের স্মৃতি নয়; একটি প্রজন্মের প্রেম, স্বপ্ন ও রোমান্টিক কল্পনার সাংস্কৃতিক প্রতীক। কিন্তু ব্যক্তিগত ভালোবাসা কখনো ইতিহাসের বাইরে নিরাপদ থাকতে পারে না। ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত সময় তাদের সম্পর্কেও ক্ষত তৈরি করে। ফলে গল্পের ট্র্যাজেডি শুধু দুই মানুষের বিচ্ছেদ নয়; রাজনৈতিক ইতিহাস কীভাবে ব্যক্তিমানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত সুখটুকুও কেড়ে নেয়, তার বেদনাময় ভাষ্য।
‘কর্পূর’ এবং ‘যে রাতে আমি মদ্যপান করিনি’ বাস্তবতার ভেতর আরেক বাস্তবতার দরজা খুলে দেয়। কর্পূরের মতো দৃশ্যমান হয়েও মিলিয়ে যাওয়া, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রবণতা লেখকের গল্পে রহস্য তৈরি করলেও তার লক্ষ্য নিছক চমক নয়। আপাত-অলৌকিক ঘটনার নিচে লুকিয়ে থাকে খুব পরিচিত কোনো মানবিক সত্য।
‘বিভ্রম’ আমাদের সময়ের একটি ভয়াবহ পারিবারিক সত্য সামনে আনে। রাজীবের উগ্র ধর্মীয় চেতনা এক দিনে জন্ম নেয় না; সেটি পরিবারের চোখের সামনে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। সমাজকে চিনতে পারা বাবা রাশেদ নিজের সন্তানকে চিনতে দেরি করেন। এই দেরিই গল্পটির সবচেয়ে মর্মান্তিক জায়গা। লেখক এখানে কেবল একজন উগ্রবাদী তরুণের ছবি আঁকেননি; দেখিয়েছেন যোগাযোগহীন পরিবার, অমনোযোগী অভিভাবকত্ব এবং বিকৃত মতাদর্শ কীভাবে একে অন্যকে শক্তিশালী করে। গল্পের শেষে রাশেদের আত্মোপলব্ধি তাই ব্যক্তিগত অনুশোচনার চেয়েও বড় একটি সামাজিক সতর্কবার্তা।
নামগল্প ‘খুন ও হুইসেল’-এ লেখকের সাংবাদিকসুলভ পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে প্রবলভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠে। আমবাগান ও জেনেভা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার ইতিহাস, বাঙালি-বিহারি সামাজিক টানাপোড়েন, দলীয় রাজনীতির ক্ষমতা বিস্তার এবং প্রশাসনের ফাঁক গলে শামসুর মতো অপরাধীর নিরাপদ হয়ে ওঠা সব মিলিয়ে গল্পটি ক্রাইম ফিকশনের সীমানা অতিক্রম করে। এখানে খুন কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থার ফল, যেখানে অপরাধী, রাজনীতি ও প্রশাসনিক সুবিধা পরস্পরকে রক্ষা করে। আর হুইসেলটি কেবল পুলিশের নয় এটি লেখকের, বিবেকবান মানুষের এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকেরও।
সংকলনের শেষ গল্প ‘আবসেরাব’ সম্ভবত বইটির সবচেয়ে দহনময় সামাজিক উচ্চারণ। মহিউদ্দিনের মুখের দাড়ি চলে যাওয়ার মতো তুচ্ছ একটি ঘটনাকে প্রথমে সন্দেহ, পরে গুজব এবং শেষে ধর্মীয় বিদ্বেষে রূপান্তরিত হতে দেখি। একটি নিরীহ সেলফি বিকৃত ক্যাপশনে ছড়িয়ে পড়ে; সত্যের জায়গা দখল করে ভাইরাল মিথ্যা। ব্যক্তি, ফেসবুক, জনতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, আইন ও সাংবাদিকতার ব্যর্থতা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত জ্যোৎস্নার শরীর পর্যন্ত আগুন পৌঁছে দেয়। এই গল্পে আগুন কেবল একজন মানুষকে পোড়ায় না-পুড়িয়ে দেয় সমাজের যুক্তিবোধ ও বিবেককেও।
‘ব্রেকিং নিউজ’ ও ‘জমিনদার’ এই শিরোনাম দুটিও সংকলনের বৃহত্তর জগতের সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে মিশে যায়। একটি শিরোনাম সংবাদকে পণ্য ও উত্তেজনায় রূপান্তরের ভাষা মনে করায়; অন্যটি মালিকানা, শ্রেণি ও কর্তৃত্বের সামাজিক অভিঘাত সামনে আনে। আর ‘আবসেরাব’ নামের স্থানীয় স্বাদ বইটির চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক শিকড়কে আরও দৃশ্যমান করে।
বাদলের ভাষা সহজ, সংলাপনির্ভর এবং অপ্রয়োজনীয় অলংকার থেকে মুক্ত। আবেগ আছে, কিন্তু আবেগের প্রদর্শনী নেই। তিনি চরিত্রকে বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রায় ঘোষণা করেন না; বরং এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে রাখেন, যেখানে পাঠক নিজেই মানুষ, সমাজ ও ব্যবস্থার দায় নির্ধারণ করতে বাধ্য হন। গল্পগুলোর শেষও সম্পূর্ণ সমাপ্তি নয় শেষ বাক্যের পরেও অস্বস্তি, প্রশ্ন ও অনুশোচনা থেকে যায়।
একটি পাঠক-আকাঙক্ষা অবশ্য থেকে যায়। চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট জনপদে গড়ে ওঠা কয়েকটি গল্পে স্থানীয় কথ্যভাষার আরও স্বাভাবিক ও নিবিড় ব্যবহার চরিত্রগুলোর শিকড়কে হয়তো আরও স্পর্শযোগ্য করে তুলতে পারত। তবে প্রমিত ও সহজবোধ্য ভাষা নির্বাচন বইটিকে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছেও প্রবেশযোগ্য করেছে এটিও লেখকের সচেতন শিল্পসিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায়।
সবশেষে বলতে হয়, খুন ও হুইসেল শুধু অপরাধ, বিভ্রম, প্রেম, উগ্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিকৃতি, যেখানে সত্যের চেয়ে গুজব দ্রুত চলে, অপরাধীর চেয়ে প্রতিবাদী মানুষ বেশি অসহায় হয় এবং ব্যক্তিগত ভালোবাসাও রাজনৈতিক ইতিহাসের আঘাত থেকে রক্ষা পায় না।
কামরুল হাসান বাদল পাঠকের হাতে শুধু একটি গল্পের বই তুলে দেননি; তিনি একটি হুইসেলও তুলে দিয়েছেন। চারপাশের অন্যায় দেখে আমরা সেটি বাজাব, নাকি নীরবে পকেটে রেখে দেব বই শেষ হওয়ার পর সেই প্রশ্নটিই দীর্ঘ সময় আমাদের অনুসরণ করে।

---------