মতামত সম্পাদকীয়

চট্টগ্রাম বন্দর ও মহাসড়কে কন্টেইনার গায়েব চোরের সিন্ডিকেট রুখবে কে

দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। আর এই বন্দরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৈরি পোশাক খাতসহ দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্দর থেকে পণ্যবোঝাই কন্টেইনার গায়েব হওয়া এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সুপরিকল্পিতভাবে পণ্য চুরির ঘটনা দেশের ব্যবসায়ী মহলে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। একটি কন্টেইনার যখন বন্দর থেকে ছেড়ে যায় বা বন্দরে আসে, তখন তার পেছনে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিশ্বাস জড়িত থাকে। মহাসড়কে বা বন্দর এলাকা থেকে সেই কন্টেইনার আস্ত গায়েব হয়ে যাওয়া কিংবা সিলগালা অক্ষত রেখে ভেতর থেকে পণ্য চুরি হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ চুরির ঘটনা নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ, সুগভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের অপরাধ।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অপরাধের শিকার হয়ে ব্যবসায়ীরা যখন আইনের দ্বারস্থ হচ্ছেন, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আশানুরূপ কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। মামলা দায়ের, তদন্ত আর আইনি মারপ্যাঁচের আবর্তে পড়ে প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। অনেক সময় চুরি যাওয়া পণ্যের আংশিক উদ্ধার হলেও মূল হোতারা বা এই সিন্ডিকেটের পেছনে থাকা প্রভাবশালীরা সবসময়ই রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বছরের পর বছর ধরে এই ধারা চলায় অপরাধীদের মনে এক ধরনের ‘দায়মুক্তি’র সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে এই চক্রকে কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন তাদের কৌশল আরও আধুনিক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা জিপিএস ব্যবহারের পরও কীভাবে কন্টেইনারের পণ্য গায়েব হয়, তা এক বিরাট রহস্য।
এই ধারাবাহিক লোকসান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে ব্যবসায়ীদের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। অনেক বিদেশী ক্রেতা যথাসময়ে পণ্য না পেয়ে অর্ডার বাতিল করছেন, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎসে বড় আঘাত। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের চালিকাশক্তি এই ব্যবসায়ীদের অভয় দেওয়া। রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে স্পষ্ট ভাষায় এই বার্তা দিতে হবে যে, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ এবং পণ্যের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এই অভয় কেবল মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
কন্টেইনার গায়েব ও চুরি বন্ধে অবিলম্বে সড়কে এবং বন্দর সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বহুগুণ বাড়াতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই এবং বন্দরমুখী সংযোগ সড়কগুলোকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা আবশ্যক। পাশাপাশি জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেমকে আরও কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে, যাতে কোনো কন্টেইনারবাহী লরি নির্ধারিত রুটের বাইরে সামান্য সময়ের জন্যও থামলে বা রুট পরিবর্তন করলে দ্রুত সংকেত পাওয়া যায়।
বন্দরের ভেতরকার নিরাপত্তা, বেসরকারি অফডক (আইসিডি) এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তা কঠোর হস্তে তদন্ত করা দরকার। কেবল চোর বা চালককে গ্রেপ্তার করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না; এই পণ্যের অবৈধ ক্রেতা এবং চোরাই সিন্ডিকেটের মূল অর্থদাতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে এই কন্টেইনার চোর চক্রকে উপড়ে ফেলার কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবিলম্বে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে—এটাই আজ সময়ের দাবি।