চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস বা ডেঙ্গুর ধকল কাটতে না কাটতেই নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাম’। গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগরের ৯টি ওয়ার্ডকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকেরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। একটি সংক্রামক ব্যাধির এমন আকস্মিক ও তীব্র বিস্তার কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে ধরে।
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত একটি সুনির্দিষ্ট টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে এই রোগটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামে বর্তমান পরিস্থিতি যে রূপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে কোথাও কোনো বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নগরের নির্দিষ্ট ৯টি ওয়ার্ডে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার পেছনে ঘনবসতি, ভাসমান জনগোষ্ঠীর আধিক্য এবং সচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হতে পারে টিকাদান কাভারেজ থেকে কোনো একটি বড় অংশের বাদ পড়ে যাওয়া। করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে রুটিন টিকাদানে যে শিথিলতা বা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সংকট তারই খেসারত কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আইসোলেশন ওয়ার্ডের প্রয়োজন হয়, কারণ সাধারণ ওয়ার্ডে রাখলে অন্য রোগাক্রান্ত শিশুদের মাঝে এটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমনিতেই রোগীর চাপ থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এর ওপর হামের এই আকস্মিক ঢেউ চিকিৎসাব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে বা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়ার দৃশ্য যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি তা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দুটি: প্রথমত, আক্রান্তদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে মৃত্যুর হার শূন্যে রাখা; দ্বিতীয়ত, সংক্রমণের চেইন বা বিস্তার টেনে ধরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) যৌথভাবে যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাতে হবে। শুধু নিয়মিত টিকাদান দিয়ে এই ধাক্কা সামলানো যাবে না।
চিহ্নিত ৯টি হটস্পট ওয়ার্ডে অবিলম্বে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাতে হবে। ৯ মাস থেকে শুরু করে ১৫ বছর বয়সী যেসব শিশু বা কিশোর-কিশোরী হামের টিকা (এমআর) নেয়নি বা ডোজ পূর্ণ করেনি, তাদের চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে টিকা দিতে হবে।
সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে আক্রান্তদের জন্য অস্থায়ী আইসোলেশন ও ফিল্ড চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
অনেক অভিভাবক হাম হলে শিশুকে ঘরে আটকে রাখেন বা কবিরাজি চিকিৎসা করান, যা শিশুর নিউমোনিয়া বা ব্রেন ড্যামেজের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। লিফলেট এবং চসিকের প্রচার গাড়ির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে যাতে লক্ষণ দেখামাত্র শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের এই হামের প্রাদুর্ভাব সারা দেশের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সামান্য উদাসীনতা বা নজরদারির অভাব কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করল। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্লেম-গেম বা দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। চট্টগ্রামের শিশুদের এই সংক্রামক ব্যাধির ছোবল থেকে বাঁচাতে এখনই সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করার বিকল্প নেই।
মতামত সম্পাদকীয়





















































