মতামত সম্পাদকীয়

সবজির বাজারে আগুন : অসহায় স্বল্প আয়ের মানুষ

চট্টগ্রামে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও নিচু এলাকায় সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতা এবং বন্যা জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রাম জুড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে, বিশেষ করে সবজির বাজারে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে নগরীর কাঁচাবাজারগুলোতে এমন কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না, যার দাম কেজিপ্রতি এক শত টাকার নিচে। এমনকি কাঁচা মরিচের দামও আকাশচুম্বী। চাল, ডাল, তেলের পাশাপাশি দৈনন্দিন রান্নার এই অতি প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চট্টগ্রামের স্বল্পবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সরবরাহ লাইনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানি জমার সঙ্গে সঙ্গেই সবজির দাম এক ধাক্কায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়মের মধ্যে পড়ে না। চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের উপজেলাগুলো যেমন পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, কিংবা উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও রাউজানেরর একাংশের কৃষিজমি বন্যায় তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে—তা সত্যি। তবে চট্টগ্রাম নগরের পাইকারি ও খুচরা বাজারের মূল সমস্যা কেবল সরবরাহের ঘাটতি নয়; বরং দুর্যোগকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের অতি মুনাফালোভী মানসিকতা।
হালকা বৃষ্টিতেই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার কিংবা পাহাড়তলীসহ বড় পাইকারি বাজারগুলো থেকে শুরু করে অলিগলির খুচরা বাজার পর্যন্ত কৃত্রিম সংকট তৈরির মহড়া শুরু হয়। আড়ত থেকে খুচরা দোকানদার—হাতবদলের প্রতিটি ধাপে যে পরিমাণ লভ্যাংশ যোগ করা হয়, তা কোনো সুস্থ বাজার ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। ফলে এক হাজার বা বারো শত টাকা আয় করা একজন দিনমজুর বা নির্দিষ্ট বেতনের একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে পুরো সপ্তাহের বাজার শেষ করে পরিবার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। খাবারের থালা থেকে পুষ্টিকর উপাদানগুলো একে একে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আর নীরব দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না। শুধুমাত্র বৃষ্টির অজুহাত মেনে না নিয়ে, আসল সরবরাহ ঘাটতি ও কৃত্রিম সংকটের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বের করতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বাজারে দৈনিকভিত্তিতে কঠোর মনিটরিং সেল চালু করা প্রয়োজন। পাইকারি কেনা দামের সঙ্গে খুচরা বিক্রয়মূল্যের যৌক্তিক ব্যবধান নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং প্রতিটি দোকানে মূল্য তালিকা দৃশ্যমান রাখা নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টিসিবি-র মতো সংস্থার মাধ্যমে খোলা বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে সবজি বিক্রির জরুরি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বানভাসি মানুষের সহায়তার পাশাপাশি শহরের খেটে খাওয়া মানুষের থালায় অন্নসংস্থানের সুযোগ বজায় রাখা সরকারের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। সিন্ডিকেটের কারসাজি ও অসৎ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে, এই বর্ষায় চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের দুর্দশা চূড়ান্ত রূপ নেবে।

-advertise-