পরিস্থিতি মোকাবেলায় কী ভাবছে কর্তৃপক্ষ
বর্ষাকাল মানেই যেখানে দুকূল প্লাবিত হওয়া নদ-নদী আর টইটুম্বুর জলাধারের ছবি চোখে ভাসে, সেখানে কাপ্তাই হ্রদের বর্তমান চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত এবং চরম উদ্বেগজনক। আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ ছুঁইছুঁই এই ভরা বর্ষাতেও দেশের বৃহত্তম এই কৃত্রিম হ্রদটি একপ্রকার পানিশূন্যতায় ভুগছে। অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে হ্রদের পানির স্তর, যা কেবল পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিকেই সংকটে ফেলেনি, বরং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহেও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ভরা মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের এই ‘মরুকরণ’ দশা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের চরম অভিঘাত এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার এক নির্মম সমীকরণ।
কাপ্তাই হ্রদের পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। হ্রদের পানির ওপর নির্ভরশীল কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে মাত্র দুটি বা একটি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে, তাও সীমিত ক্ষমতায়। ফলে দেশজুড়ে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্রতর হচ্ছে। এর পাশাপাশি হ্রদকেন্দ্রিক নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাঙামাটির ৪টি উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এই নৌপথ। পানি কমে যাওয়ায় লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় পাহাড়ি অর্থনীতি, পর্যটন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে।
এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখন আর সাময়িক জোড়াতালির সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। কাপ্তাই হ্রদের তলদেশ ব্যাপকভাবে পলি ও বর্জ্য জমে ভরাট হয়ে গেছে। সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত এই হ্রদে কোনো বড় ধরনের ড্রেজিং বা খননকাজ করা হয়নি। অবিলম্বে হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু করতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের নির্বিচার পাহাড় কাটা এবং বন উজাড় বন্ধ করতে হবে। বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ার কারণে বর্ষার বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি ধুয়ে সরাসরি হ্রদে এসে পড়ছে এবং তলদেশ ভরাট করছে। তাই কাপ্তাই হ্রদের ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা অববাহিকা অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বনায়ন করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পানির টেকসই ব্যবস্থাপনানীতি গ্রহণ করতে হবে। বৃষ্টিপাতের অভাব বা অনিয়মিত আচরণের কথা মাথায় রেখে শুষ্ক ও বর্ষা উভয় মৌসুমের জন্যই পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
কাপ্তাই হ্রদ কেবল একটি কৃত্রিম জলাধার নয়, এটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, জীবনজীবিকা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সচলতা বজায় রাখতে কাপ্তাই হ্রদকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই। সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ড্রেজিং ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।





















































