এ মুহূর্তের সংবাদ

মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সংকট টেকসই শিল্পায়নের পথে বড় অন্তরায়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এই মেগা প্রকল্পকে ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৮ বছর পার হওয়ার পরও এই শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয়। গ্যাস, পানি ও অন্যান্য মৌলিক ইউটিলিটি সেবার তীব্র সংকটে বহু বিনিয়োগকারী কারখানা প্রস্তুত করেও উৎপাদনে যেতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি শুধু উদ্যোক্তাদের হতাশ করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের বিনিয়োগবান্ধব ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে।

একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মূল আকর্ষণ হলো—সেখানে বিনিয়োগকারীরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত সব ধরনের নাগরিক ও শিল্প সুবিধা পাবেন। কিন্তু মীরসরাইয়ের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারখানার অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করেছেন। উৎপাদনে যেতে না পারায় তাদের বিনিয়োগ করা মূলধন অলস পড়ে আছে, যার ফলে ব্যাংক ঋণের সুদ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন পিছিয়ে যাওয়া মানেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানো। এভাবে চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এই অঞ্চলে পুঁজি বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিতে পারে।
এই চরম জ্বালানি সংকটের মধ্যেই জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঘাট, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও খাল উন্নয়নে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা ও যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়তো প্রয়োজনীয়, তবে এই মুহূর্তে সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যেখানে কারখানার মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ গ্যাসের অভাব দূর করা যাচ্ছে না, সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন বা আনুষঙ্গিক অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা দরকার। চমৎকার ওয়াকওয়ে বা উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা কখনোই একটি বন্ধ কারখানাকে সচল করতে পারে না। সরকারের উচিত ছিল এই মুহূর্তে গ্যাস ও পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে অর্থায়ন ও নীতিগত মনোযোগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
বর্তমানে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি এমনিতেই সংকটাপন্ন। এই বাস্তবতায় মীরসরাইয়ে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলেও সেখানে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর সংশয় রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দূর করতে না পারলে শুধু আশ্বাসের বাণী দিয়ে দেশি-বিদেশি বড় পুঁজি ধরে রাখা যাবে না। শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই শিল্পায়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
আমরা মনে করি, মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করতে সরকারকে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন নয়, বরং সেখানে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখা যাবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা দরকার। প্রয়োজনে বিকল্প জ্বালানি উৎস বা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এলএনজি সরবরাহের মাধ্যমে হলেও এই মেগা শিল্পাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় অর্থনীতির গতি সচল রাখার স্বার্থে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের গ্যাস ও ইউটিলিটি সংকট দূর করাকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কারখানার মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে মহাপরিকল্পনার এই বিশাল আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কালক্ষেপণ না করে এই সংকটের দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।