কালাম আজাদ »
শহরের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটবাড়ি| সাধারণ মানুষ, সাধারণ জীবন| কিন্তু কিছু কিছু “সাধারণতা” আসলে দাঁড়িয়ে থাকে এক চরম অ¯^াভাবিকতার ওপর যা কেউ সহজে স্বীকার করতে চায় না| সেদিন সকালে রুমি স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল| তার বড় বোন তাকে তাড়া দিচ্ছিল, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, বাবা তখনো অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতিতে মগ্ন| সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল যেমনটা প্রতিদিন থাকে| এরপর দুপুর হওয়ার আগেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল|
রুমি আর স্কুলে পৌঁছায়নি| প্রথমে কেউ বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি| “বাচ্চা হারিয়েছে” এই শহরে এটা নতুন কিছু নয়| কখনো প্রতিবেশীর বাসায় থাকে, কখনোবা কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে যায়| কিন্তু দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও যখন রুমি ফিরল না, উদ্বেগ ধীরে ধীরে আতঙ্কে রূপ নিল|
পাগলের মতো হন্যে হয়ে রুমিকে খুঁজছিলেন তার মা| ফ্ল্যাটের এদিক-ওদিক খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পাশের ফ্ল্যাটের দরজার ঠিক সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন তিনি| সেখানে অবহেলায় পড়ে আছে রুমির একটা জুতো| খুব চেনা সেই জুতো জোড়ার একটিকে ওভাবে একাকী পড়ে থাকতে দেখে মায়ের বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল| এক মুহূর্তে চারপাশের সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে গেল| এক অজানা আশঙ্কায় তার মন কু ডেকে উঠল- রুমি কি তবে এখানেই আছে? বুক কাঁপানো এক তীব্র সন্দেহ নিয়ে তিনি ওই ফ্ল্যাটের দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়লেন| ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন| কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই, কোনো রেসপন্স নেই| এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা গ্রাস করে রেখেছিল পুরো ফ্ল্যাটটাকে| ভেতর থেকে এই রহস্যময় নীরবতা পেয়ে মায়ের সেই সন্দেহ রূপ নিল এক বুকফাটা আতঙ্কে| আর তখনই প্রথমবারের মতো রুমির মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন|
তারপর শুরু হলো আসল তোলপাড়| প্রতিবেশীরা ঘর থেকে বের হলো| কেউ কেউ দরজায় কড়া নাড়ল, কেউ কেউ পুলিশে ফোন করল, আর কেউ কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল- যেন এটি তাদের কোনো দায়িত্বই নয়|
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে সেই বন্ধ দরজা ভাঙল| কিন্তু ভেতরে যা অপেক্ষা করছিল, তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না| ফ্ল্যাটের ভেতরের দৃশ্যটি ছিল এক অবর্ণনীয় নরক| রুমির নিথর দেহটা পড়ে ছিল খাটের নিচে, আর তার রক্তাক্ত মাথাটা আলাদা করে রাখা ছিল বাথরুমের একটা বালতিতে|
ফ্ল্যাটের ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, কীভাবে এক নিষ্পাপ শিশুর ওপর এমন পাশবিকতা চালানো হয় এই গল্পটা পরে আদালতের নথিতে শুকনো আইনি ভাষায় লেখা হবে| কিন্তু বাস্তবটা ছিল ভিন্ন ভয়াবহ, অমানবিক এবং এমন এক নিষ্ঠুরতায় ভরা, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না| রুমির মায়ের আর্তনাদে সেদিন পুরো শহরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল|
রুমির মৃত্যু কোনো সাধারণ “ঘটনা” ছিল না শুধু তা ছিল একটি সমাজের ভেতরে জমে থাকা নীরব সহিংসতার এক নির্মম বিস্ফোরণ| ঘটনার মূল অভিযুক্ত ছিল পাশের ফ্ল্যাটের সেই লোক সোহেল রানা| বাইরে থেকে তাকে কেউ খুব একটা আলাদা ভাবত না| পেশায় রিকশা মেকানিক, এই বাড়ির নতুন ভাড়াটিয়া| তার স্ত্রীও ছিল| প্রতিবেশীদের সাথে মাঝেমধ্যে হাসি-আড্ডায়ও মেতে উঠত সে|
আর এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার সে দেখতে ভীষণ “¯^াভাবিক” ছিল| মানুষ যত ¯^াভাবিকতার মুখোশ পরে থাকে, অনেক সময় তার ভেতরের অ¯^াভাবিকতা ততটাই গভীর হয় এ কথা আমরা কেউ আগেভাগে ভাবতে চাই না|
ঘটনার পর যখন তদন্ত শুরু হলো, তখন আরও একটি নাম সামনে এলো তার স্ত্রী ¯^প্না| প্রমাণ, সাক্ষ্য আর প্রতিবেশীদের ভাঙা ভাঙা কথায় ধীরে ধীরে এমন এক চিত্র দাঁড়িয়ে গেল, যেখানে শুধু একজন অপরাধী নয়, বরং অপরাধের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এক নির্মম নীরবতা| কেউ কিছু শুনেছিল, কেউ কিছু দেখেছিল, কেউবা সন্দেহও করেছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে এসে থামায়নি| কারণ এই সমাজে “সন্দেহ” করা সহজ, কিন্তু অন্যের বিষয়ে “হস্তক্ষেপ” করা কঠিন|
আর এরই মধ্যে শুরু হলো এক সমান্তরাল তামাশা ফেইসবুকবাজি| অন্যকি মিডিয়াওয়ালাদের টিআরপি বাণিজ্য|
বাস্তবে রুমির মা যখন ঘরের ভেতর শোকে পাথর হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ফ্ল্যাটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু অতি-উৎসাহী তরুণ ব্যস্ত ছিল ঘটনার লাইভ স্ট্রিমিং করতে| রুমির একাকী পড়ে থাকা সেই জুতোর ছবি তুলে কেউ ক্যাপশন লিখল
“পাশে থেকেও আমরা জানতে পারলাম না! হায়রে সমাজ! জাস্ট লুক অ্যাট দ্য শো’, ইমোশনাল ব্রো!”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রুমিকে নিয়ে হাজার হাজার পোস্ট ˆতরি হলো| কেউ জুতোর ওপর কষ্টের গান ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজিয়ে রিলস বানাল, কেউ অপরাধীর ফাঁসি চেয়ে কৃত্রিম কান্নার ভিডিও আপলোড করল| ফেইসবুকের নিউজফিড ভেসে গেল জাস্টিস হ্যাশট্যাগে| কমেন্ট বক্সে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার মতো করে মানুষ নিজেদের ক্ষোভ আর স্যাড রিঅ্যাকশন জমিয়ে তুলতে লাগল|
পিছিয়ে থাকলো না মূলধারার মিডিয়া, টিভি, পত্রিকা আর অনলাইন পোর্টালগুলো| ‘মিডিয়াওয়ালারা’ ঝাঁপিয়ে পড়লো লাশের গন্ধ শুঁকে কাটতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায়| ক্লিকবেইট নিউজের নেশায় অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো ভেতরের অমানুবিক নিষ্ঠুরতা ছাপিয়ে খুনের কাল্পনিক ও রোমহষক বিবরণ ˆতরি করতে ব্যয় হয়ে উঠল| খবরের রিচ আর ভিউ বাড়ানোর জন্য রুমির মা-বাবার বুকফাটা কান্নার ভিডিও’র ওপর বড় বড় লেখা ‘সন্তানের কাটা মাথা দেখে মায়ের কী অবস্থা! দেখুন লাইভ ডিডিও| ঘরের ভেতরে মৃত মেয়ের ধুয়ে রাখা স্কুলড্রেস জড়িয়ে ধরে থাকা মা-বাবার ঘরে ঢুকে ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে ক্যামেরা তাক করল সাংবাদিকেরা| বুমটা মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল, “মেয়ের এই অবস্থায় আপনার কেমন অনুভূতি হচ্ছে?” যেন এক তাজা ট্র্যাজেডি তাদের কাছে কেবলই নিউজ ফিডের ক্লিক আর কাগজের কাটতি বাড়ানোর দারুণ এক উপাদান!
সেই ভার্চুয়াল কান্নার পেছনে কোনো প্রকৃত সহানুভূতি ছিল না; ছিল শুধু ভিউ পাওয়ার লোভ, রিচ বাড়ানোর সস্তা প্রতিযোগিতা| যারা পাশের ফ্ল্যাটের মায়ের আর্তনাদ নিজ কানে শুনেও দরজা খোলেনি, তারা ফেইসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস লিখে ‘বিবেক’ জাহির করতে লাগল|
মামলা শুরু হলো|
প্রথম সপ্তাহে খবর হলো আসামি গ্রেফতার|
দ্বিতীয় সপ্তাহে খবর এলো জিজ্ঞাসাবাদ চলছে|
তৃতীয় সপ্তাহে জানা গেল আইনজীবী নিয়োগ হয়েছে|
চতুর্থ সপ্তাহে খবরের শিরোনাম বদলে গেল “তদন্ত চলমান”|
ধীরে ধীরে ফেইসবুকের সেই টাইমলাইন আর পত্রিকার পাতা থেকেও রুমির ছবিগুলো হারিয়ে যেতে লাগল| সেখানে জায়গা করে নিল নতুন কোনো ভাইরাল স্ক্যান্ডাল, নতুন রোমাঞ্চকর ট্রল কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক ইস্যু| রুমির কেসটি ফাইলের ভেতরে ঢুকে গেল, আর ফাইলটি আলমারির কোণে ধুলো জমাতে শুরু করল| ভার্চুয়াল ট্রাফিক জ্যাম আর মিডিয়ার ক্যামেরা এখন অন্য কোনো নতুন রাস্তায় চলে গেছে|
রুমির বাবা একজন অতি সাধারণ মানুষ| বড় কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, ক্ষমতা নেই, মিডিয়ার জোর নেই| তার শুধু একটা জিনিসই ছিল মেয়ের প্রতি অসীম ও বুকফাটা ভালোবাসা|
ঘটনার পর যখন পুলিশ তদন্তে এলো, তখন তারা গতানুগতিক আইনি প্রক্রিয়ার নানা আশ্বাস দিচ্ছিল| কিন্তু সেইসব ফাঁপা আশ্বাসের মুখে দাঁড়িয়ে রুমির বাবা সোজাসুজি পুলিশের সামনেই বলে দিলেন-
“ আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না| আমার মেয়েও আর কোনোদিন ফিরে আসবে না| আপনাদের বিচারের কোনো জুতসই উদাহরণ নেই| এই আলোচনা বড়জোর ১৫ দিন চলবে| ফেইসবুকে আরও কিছুদিন লাইক-শেয়ারের তামাশা হবে| তারপর আবার নতুন কোনো ঘটনা ঘটবে| তখন তা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যাবে|”
তার গলা কাঁপছিল না, চোখেও কোনো বাড়তি আবেগ ছিল না; ছিল এক ধরনের শান্ত ও অবশ করে দেওয়া ক্লান্তি| তিনি যোগ করলেন
“আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম এই দেশ কি একটা শিশুর মৃত্যুকে সত্যি সত্যি গুরুত্ব দিতে পারে? কিন্তু আমি আমার উত্তর পেয়ে গেছি|”
আদালতের কার্যক্রম চলতেই থাকল| আইনজীবীরা যুক্তি দিলেন, রাষ্ট্রপক্ষ কাগজ দেখাল, আসামিপক্ষ ব্যাখ্যা দিল| সবকিছুই ছিল ভীষণ “আইনি”| কিন্তু সেই আইনি লড়াইয়ের কোথাও একটা নিষ্পাপ শিশুর নাম ছিল না; ছিল শুধু ধারা, উপধারা, সাক্ষ্য আর প্রতিবেদন| মানুষের জীবন ও মৃত্যু এখানে এসে কেবল একটি “কেস ন¤^র” হয়ে যায়|
একজন বৃদ্ধ প্রতিবেশী একদিন আক্ষেপ করে বললেন-
“আমি জানতাম কিছু একটা ভুল হচ্ছে| কিন্তু ভাবছিলাম, আমার কী-ই বা করার আছে?”
এই একটি বাক্যই আসলে এই পচে যাওয়া সমাজের সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি|
মাস কেটে বছর হলো| মামলা এখনো “চলমান”| এখানে বিচার মানে ন্যায়বিচার নয় অপেক্ষা| আর অপেক্ষা মানে ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলে যাওয়া| ফেইসবুকের সেই ভাইরাল আইডিগুলো আর পত্রিকাওয়ালারা এখন নতুন কোনো ট্রেন্ড, নতুন কোনো চটকদার শিরোনাম নিয়ে মেতে আছে|
রুমির মা এখন আর খুব একটা কথা বলেন না| তিনি মাঝে মাঝে মেয়ের স্কুলড্রেসটা আলমারি থেকে বের করে যত্ন করে ভাঁজ করেন, আবার খুলে রাখেন| যেন কোনো একদিন রুমি হুট করে স্কুল থেকে ফিরে বলবে
‘মা, জামাটা ধুয়ে দাও|’
কিন্তু কেউ আর আসে না|
এই শহরে প্রতিদিন নতুন কিছু ঘটে| নতুন খবর আসে, নতুন ক্ষোভ জন্মায়, নতুন হ্যাশট্যাগ ˆতরি হয়| তারপর সময়ের স্রোতে সবকিছু মুছে যায়| কিন্তু কিছু কিছু ক্ষত কখনোই মুছে যায় না| তারা শুধু স্তব্ধ হয়ে যায়| আর সেই স্তব্ধতার ভেতরেই একাকী এক প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে
“একটি সমাজ কতবার তার সন্তানদের হারিয়ে বুঝবে, সে সমাজ আসলে কখনোই নিরাপদ ছিল না? আর কত নিষ্পাপ মানুষ নির্মম হত্যার শিকার হলে এবং কত হাজার লাইক-শেয়ার আর পত্রিকার কাটতির পর অবশেষে এই অলস রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘুম ভাঙবে, তারা সত্যি সচেতন হবে?”



















































