ফিচার শিল্প-সাহিত্য

ভাটিয়ালি গান : লোকসঙ্গীতের স্বতন্ত্রধারা

অমল বড়ুয়া »

ভাটিয়ালি গান হলো বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি ¯^তন্ত্র ধারা, যা প্রধানত বাংলাদেশের নদীবহুল অঞ্চল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গাওয়া হয়​| ভাটিয়ালি গান মূলত বাংলার নদীমাতৃক অঞ্চলের মাঝিদের দ্বারা সৃষ্ট একটি ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত, যা ‘ভাটা’ বা নদীর স্রোতের সাথে পাল তুলে বয়ে চলার সময় গাওয়া হয়| দীর্ঘ টান, একলয়, এবং নদী-প্রেম-বিচ্ছেদ-আধ্যাত্মিকতার মিশ্রণে এটি বিকশিত হয়েছে|
ভাটিয়ালি সাধারণত এককভাবে গাওয়া হয়, দলবদ্ধভাবে নয়| ভাটিয়ালি গান খুব একটা ছন্দবদ্ধ নয়, তবে অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য এবং শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করার জন্য প্রোলগ নোট থাকে| এই গানগুলি সাধারণত তার সপ্তক বা উচ্চ ¯^র দিয়ে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে নিম্ন ¯^র বা মধ্য ও মন্দ্র সপ্তকে নেমে আসে| এই ধারার গানগুলো সাধারণত তাল-লয়ের দিক থেকে ধীরগতির ও অপ্রথাগত; তবু এতে সুরের মাধুর্য ও গভীরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| সুরের দিক থেকে ভাটিয়ালী গান কিছু নির্দিষ্ট রাগের সুরের ধাঁচ অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হয় এবং উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগকেও এই লোকধারার সুর প্রভাবিত করেছে| ভাটিয়ালী গানের কথাগুলো রূপক অর্থবহ ও আবেগঘন; এতে নদীর প্রবাহ, নৌকা, মাঝি প্রভৃতি উপমার মাধ্যমে মানব জীবনের অনিশ্চয়তা, বিচ্ছেদ, ঐহিত্য এবং প্রকৃতির রূপরস তুলে ধরা হয়​|
‘ভাটিয়ালী’ শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে বাংলা ‘ভাটা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ নদী বা সাগরের জলস্তরের নিম্নগতিপ্রবাহ বা ভাটার টান| ‘ভাটি’ শব্দের উত্তর ভাবার্থে ‘আল’ প্রত্যয় যোগ করেই ‘ভাটিয়াল’| আর এই ‘ভাটিয়াল’ থেকে ভাটিয়ালি শব্দ গঠিত হয়েছে| ভাটি অঞ্চলের গান বলেই নাম ‘ভাটিয়ালি’| গানগুলির বিচার করতে গেলে ভাটিয়ালি গান আসলেই ‘প্রবন্ধ যুগের গান’| এ প্রবন্ধ-সঙ্গীতে ‘আলী’ নামক প্রবন্ধে উল্লেখ রয়েছে| ‘আলী’ প্রকরণটিকে আবার অলংকৃত প্রবন্ধের সঙ্গে মিশ্র রূপে, সাধারণ ভাট পর্যায়ের লোকেরাই ব্যবহার করতো| ভাটিয়ালির মধ্যেই ‘আলী’ প্রকরণের প্রভাব বা ছায়া রয়েছে| প্রবন্ধ-সঙ্গীতের আলী প্রকরণের অন্তর্গত হলো- ভাটিয়ালি গান| ভাটমুখে ‘ভাটিয়ালি সঙ্গীত’ মূল গান হলেও পরবর্তী কালে নৌকার ‘মাঝি-মাল্লারা’ এমন গানেই ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী হয়ে বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়েছে| পল্লী কবি জসীমউদ্দীন পূর্ববাংলার নৌকার মাঝি-মাল্লাদেরকেই ‘ভাটিয়ালি গানের মুখ্য রূপকার’ হিসেবেই অভিহিত করেছেন| ‘ভাটিয়ালির নামকরণের অর্থ’ নানানজনে নানান ভাবেই ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন| কেউ বলে, নদীর ভাটির স্রোতের টানেই- ‘বিভিন্ন প্রকারের নৌকা’ ভাসিয়ে মাঝিগণ যে গান করতো, সেই গানই ‘ভাটিয়ালি’| আবার কেউ কেউ বলেছেন, এই বাংলার ভাটি অঞ্চলের নৌকা-মাঝির গানই ভাটিয়ালি গান|
ভাটিয়ালী গানের গোড়াপত্তনে চর্যাপদের সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান| ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ হচ্ছে চর্যাপদের রচনার সময়কাল| ভাটিয়ালি গানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে গবেষকগণ চর্যাপদের কবি ভুসুকুপার রচিত ৪৩ সংখ্যক পদের ‘বঙ্গাল’ রাগটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যাকে ‘ভাটিয়ারি’ বা ‘ভাটিয়ালি’ বলে মনে করা হয়| ভুসুকুপা রচিত চর্যাপদের ৪৩ সংখ্যক পদটি হলো-
‘সহজ মহাতরু স্ফুরিত এ ত্রিলোকে
খসম ¯^ভাবে বাঁধন হইতে মুক্ত বল কে
যেমন জলে পানি টলিলে ভেদ করা না যায়
তেমন মনোরত্ন রে সমরসে গগনে সামায়
যার নাই রে আপন তার আর পর কোথায়
আদৌ অনুৎপন্ন স¤^ন্ধে জন্ম মরণ ভব নাই
ভুসুকুপার সাথে রাজপুত বলে সকলই এক ¯^ভাব
এখানে না যায় না আসে রে তার ভাবাভাব||’
এছাড়াও চর্যাপদের যে সকল পদে ভাটিয়ালি গানের ˆবশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলো হলো- ৫, ৮, ১০, ১৩, ১৪, ৩৮, ৪৯ প্রভৃতি সংখ্যক পদ| এই সকল পদে নদী তীরবর্তী মানুষের অন্তহীন জীবন জিজ্ঞাস্য ও ‘বিষণ্ন ˆবরাগ্যের’ কথা বর্ণিত হয়েছে|
১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর দশককে ভাটিয়ালীর ¯^র্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয়| আব্বাসউদ্দীন আহমেদ ভাটিয়ালি গানকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যান| এছাড়াও উমেদ আলী, মিরাজ আলী, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দিন এবং আধুনিক যুগে বারী সিদ্দিকী ও মলয় গাঙ্গুলী এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন|
ভাটিয়ালি গান কেবল ক্ষতি, বেদনা এবং স্মৃতিই প্রকাশ করে না, বরং প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধিও প্রকাশ করে| ভাটিয়ালি গান বাংলার নদীমাতৃক অঞ্চল থেকে উদ্ভূত লোকগীতির একটি ধারা, যার একটি শক্তিশালী পরিবেশগত সংযোগ রয়েছে| এটি মূলত একক কণ্ঠে গাওয়া গান| এর প্রধান বিষয় হলো মাঝির জীবনের সুখ-দুঃখ, নদী, প্রেম, এবং ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা| সুরের মধ্যে একটি অদ্ভুত উদাসী ভাব রয়েছে, যা শ্রোতাকে মুগ্ধ করে-
‘এ ভব সাগর রে কেমনে দিব পাড়ি রে|
দিবানিশি কান্দিরে নদীর কূলে বইসা||
ও মনরে, যার আছে রসিক নাইয়া,
আগে তরী গেল বাইয়া রে|
আমি ঠেইকা রইলাম বালুচরে মাঝি-মাল্লা লইয়া রে||
ও মন রে, ভব সাগরের ঢেউ দেখিয়া,
প্রাণ-পাখী যায় উড়িয়া রে|
আমি হতভাগা পইড়া গো রইলাম ভাঙ্গা তরী লইয়া রে||’
‘ও পদ্মা নদী রে-
সর্বনাশা পদ্মানদী; তোর কাছে শুধাই|
বল আমারে, তোর কিরে আর কূল-কিনারা নাই,
নদীর কূল কিনারা নাই||’
পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অন্তর্গত, ভাটিয়ালি একটি লোকসঙ্গীত, যা নদীতীরে মাছ ধরার সময় জেলেরা গেয়ে থাকেন| ভাটিয়ালি গানের কথা ঐতিহ্যগতভাবে জল এবং জেলেদের সম্পর্কে রূপক এবং আবেগপূর্ণ পদ্যে ভরা| প্রাথমিকভাবে, বাংলাদেশে ৫ ধরণের ভাটিয়ালি ছিল, তবে এর মধ্যে কিছু রূপ এখন বিলুপ্ত| ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাষাগত ভিন্নতার সঙ্গে সুরের ¯^তন্ত্র্য ˆবশিষ্ট্য বিচারে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলকে যে ৮টি ভাগে বিভক্ত করা যায়, তা হলো- ১. বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল, ২. বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল, ৩. বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল, ৪. বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চল, ৫. বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চল, ৬. বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল, ৭. বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল, ৮. বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল|
‘আরে, মন-মাঝি, তোর ˆবঠা নেরে,
আমি আর বাইতে পারলাম না|
আমি জনম ভইরা বাইলাম ˆবঠা রে,
তরী ভাইট্যায় বয় আর উজায় না||
ওরে জঙ্গীরসী যতই কসি,
ওরে হাইলেতে জল মানে না||’
‘বৈদেশী নাইয়া রে,
কেমনে পারে যাই||
তোর কোন দোষে পলাইল রে বেপারী||
ঘাট হইতে ছাড়লাম নাও,
হারে পবনে ছাড়িল বাও রে|
নায়ের মাস্তুল ভাঙ্গিয়া পড়ল জলে রে||’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাটিয়ালি গানের সুরের ঐতিহ্য অনুসরণে বা মিশ্রণে ৪টি গান রচনা করেছিলেন, রবীন্দ্রসংগীতের ¯^রবিতানের ৯, ৪২, ৪৬ ও ৫২ খন্ডে যার প্রমাণ রয়েছে|
‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, ‘জয় মা’ ব’লে ভাসা তরী||
ওরে রে ওরে মাঝি, কোথায় মাঝি, প্রাণপণে, ভাই, ডাক দে আজি—
তোরা সবাই মিলে ˆবঠা নে রে, খুলে ফেল& সব দড়াদড়ি||’
‘আমি সংসারে মন দিয়েছিনু, তুমি আপনি সে মন নিয়েছ|
আমি সুখ ব’লে দুখ চেয়েছিনু, তুমি দুখ ব’লে সুখ দিয়েছ||
হৃদয় যাহার শতখানে ছিল শত ¯^ার্থের সাধনে
তাহারে কেমনে কুড়ায়ে আনিলে, বাঁধিলে ভক্তিবাঁধনে||’
লালন সাঁইয়ের গানের বাণী চর্যাপদের তত্ত্বকথা বা দেহসাধনা পর্বের ভাটিয়ালি গানের ঐতিহ্যকে পরম্পরা হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে| জীবনের তরী পারাপারের আকুলতা নিয়ে লালন সাঁইয়ের গাওয়া এক বিষাদমাখা গান, যার সুর ভাটিয়ালির গভীরতা ধারণ করে-
‘আমি অপার হয়ে বসে আছি
ও হে দয়াময়,
পারে লয়ে যাও আমায়
আমি একা রইলাম ঘাটে
ভানু সে বসিল পাটে-
(আমি) তোমা বিনে ঘোর সংকটে
না দেখি উপায়…
পারে লয়ে যাও আমায়’
‘পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়|
রূপকাষ্ঠের নৌকাখানি নাই ডুবার ভয়||
বেসরা নেয়ে যারা
তুফানে যাবে মারা একই ধাক্কায়|
কি করবে বদর গাজী থাকবে কোথায়||’
ভাটিয়ালি গানের প্রধান রূপকার হলেন নড়াইল জেলার কবিসুধাকর বিজয় সরকার| তাঁর রচিত ভাটিয়ালি গানের সুর-বাণী বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত ভাব-বিপ্লবে ভাসিয়ে দিয়েছে| গবেষক মতে, ‘পাগল বিজয়ের [বিজয় সরকারের] ‘বিচ্ছেদ-ভাটিয়ালী’ বাংলার অপূর্ব এক সম্পদ|’ বিজয় সরকারের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভাটিয়ালি গান-
‘আমার জীবন, জীবন নদীর নাইয়ারে,
কবে আমার তীরে ভিড়াবে নাও ধীরে ধীরে বাইয়ারে||
বের হয়েছি সেই যে ভোরে ধরণীর ধুলে,
খেলা করে বেলা গেছে দয়াল তোমারে ভূলে|
এখন দিনের শেষে নদীর কুলে রয়েছি দাঁড়াইয়ারে||’
‘নিঝুম রাতে বাঁশরী বাজাইয়া ওরে ভাটির নাইয়া
ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলি ভাইটাল সুরে-
আমি খোলা বাতায়ন পাশে বসে শুনি রাত দুপুরে||
মুচড়ে পড়ে গাঙ্গের তুফান সুর সোহাগে দোলে
ব্যথা বুকে আঘাত ঠুকে আচড়ে পড়ে কুলে,
কান্দে মলয় পবন ফুলে ফুলে মলয় কাননপুরে||’
‘ভাটির নদী বয়ে যায় রে, কয়ে যায় তার শূন্য বুকের ব্যথা|
জোয়ারে ভরিয়ে নদী যখন যে উজান দিকে চলে
তার বিপুল স্রোতে দু-কূল ভাসায় রে
কুল কুল রবে নদী কত কথা বলে
আবার ভাটির টানে ধীরে ধীরে, নদী সাগর মুখে কেঁদে ফিরে
তার হারান মন চাহে ফিরে ব্যাকুল বেদনায় রে|| …’
এই গান বাংলার লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধ সম্পদ| সব জাতির কাছেই ‘সঙ্গীত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘শিল্প মাধ্যম’| বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি সাহিত্য তত্ত্বে সবধরনের গান সম্পর্কে বলেছেন- ‘ইহকাল, মহাকাল, জীবন-তরী এবং ফসল কিংবা পরপারের সান্নিধ্য লাভেই সঙ্গীতের- ‘কথা ও সুরে’ আধ্যাত্মিকতা এবং নান্দনিক রূপ ফুটে ওঠে|’ ভাটিয়ালি গানের সুর ও বাণী মূলত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশজাত| ভাটিয়ালি গান আমাদের সরস লোক-ঐতিহ্য| এসব গানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে| আর ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প হিসেবে ভাটিয়ালিকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন|