পান্থজন জাহাঙ্গীর »
বাংলা সাহিত্যভুবনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য নাম| তিনি কেবল বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য ও প্রেমের কবি নন; অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অত্যন্ত মূল্যবান| তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন মৌলিক সৃষ্টির দীপ্তি দেখা যায়, তেমনি অনুবাদ ও ভাবানুবাদধর্মী রচনাতেও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর গভীর জ্ঞান, ভাষাবোধ, সংস্কৃতিচেতনা ও বিশ্বসাহিত্যের প্রতি অনুরাগ| অনুবাদের মাধ্যমে তিনি এক ভাষার ভাব, দর্শন ও সৌন্দর্যকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন| ফলে বাংলা অনুবাদ সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে নতুন ভাবনা, নতুন কাব্যরস ও ˆবচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উপাদানে|
নজরুল ইসলাম ছিলেন বহু ভাষাজ্ঞানের অধিকারী| আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা ভাষার ওপর তাঁর গভীর দখল ছিল| এই ভাষাগত জ্ঞানের কারণেই তিনি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য ও ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছিলেন| বিশেষ করে ফারসি সাহিত্য তাঁর মনোজগতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল| ফারসি কবিদের প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, মানবতা ও সৌন্দর্যচেতনা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল| তিনি এই সাহিত্যরস বাংলায় রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেন|
অনুবাদ সাহিত্যে নজরুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তাঁর ‘রুবাইয়াত-ই-হাফিজ’| ফারসি কবি হাফিজের কবিতার ভাবানুবাদ ও রূপান্তরের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য সম্পদ উপহার দেন| তাঁর অনুবাদে শুধু শব্দের অর্থ নয়, মূল কবিতার আবেগ, ছন্দ ও সৌন্দর্য রক্ষার চেষ্টা লক্ষ করা যায়| ফলে পাঠক হাফিজের কাব্যের আসল সুর ও মাধুর্য অনুভব করতে সক্ষম হয়|
তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুবাদকর্ম হলো ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর ˆখয়াম’| ফারসি কবি ওমর ˆখয়ামের বিখ্যাত রুবাইগুলোর বাংলা রূপান্তরের মাধ্যমে নজরুল জীবনদর্শন, প্রেম, নিয়তি ও মানবচেতনার নানা দিক বাংলাভাষী পাঠকের কাছে তুলে ধরেন| তাঁর ভাষার সৌন্দর্য ও কাব্যিক শক্তি এই অনুবাদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে|
নজরুলের অনুবাদধর্মী রচনার মধ্যে ‘কাব্য-আমপারা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য| এটি পবিত্র কোরআনের শেষাংশের ভাবানুবাদধর্মী কাব্যরূপ, যেখানে ধর্মীয় চেতনা ও কাব্যিক সৌন্দর্যের সমš^য় ঘটেছে| এর মাধ্যমে ধর্মীয় সাহিত্যকে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন|
এছাড়া নজরুল বহু আরবি ও ফারসি হামদ, নাত, গজল ও আধ্যাত্মিক কবিতার ভাবানুবাদ বাংলায় উপস্থাপন করেছেন| তিনি ফারসি কবি হাফিজ, সাদি প্রমুখের ভাবধারা অনুসরণ করে বহু গজল বাংলায় রূপ দিয়েছেন| যদিও এসব রচনার অনেকগুলোর আলাদা গ্রন্থনাম নেই, তবুও এগুলো বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর মূল্যবান অবদান হিসেবে বিবেচিত|
নজরুলের অনুবাদ সাহিত্যের আরেকটি বড় ˆবশিষ্ট্য হলো, তিনি কেবল ভাষান্তর করেননি; বরং ভাবান্তর ও কাব্যরূপান্তরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন| তিনি মূল রচনার আত্মা, আবেগ ও দার্শনিক গভীরতাকে বাংলার পাঠকের মনোজগতের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছেন| ফলে তাঁর অনুবাদ নিছক শব্দ পরিবর্তনের কাজ হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম|
অনুবাদের মাধ্যমে নজরুল বাংলা সাহিত্যে বহুসাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন| তাঁর রচনায় আরব, পারস্য ও উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান প্রবেশ করেছে| এতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন শব্দ, নতুন ভাবধারা এবং নতুন কাব্যিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে| তিনি সংস্কৃতির ভেদরেখা ভেঙে মানুষে মানুষে ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন|
নজরুলের অনুবাদ সাহিত্য তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনোভাবেরও পরিচয় বহন করে| তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কোনো একক জাতি বা ভাষার সম্পদ নয়; এটি মানবতার যৌথ সম্পদ| তাই তিনি ভিন্ন ভাষার সাহিত্য বাংলায় এনে সাধারণ মানুষের কাছে তা সহজলভ্য করে তুলেছেন| এর মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে|
সবশেষে বলা যায়, অনুবাদ সাহিত্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্থায়ী| ‘রুবাইয়াত-ই-হাফিজ’, ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর ˆখয়াম’, ‘কাব্য-আমপারা’ এবং বিভিন্ন আরবি-ফারসি ভাবানুবাদধর্মী রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে নতুন রস, নতুন দর্শন ও বিশ্বজনীন চেতনায় সমৃদ্ধ করেছেন| তাঁর অনুবাদকর্ম কেবল ভাষান্তরের কাজ নয়; বরং ছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক সেতুবন্ধন| তিনি আমৃত্যু লিখতে পারলে তার এ বিস্ময়কর অনুবাদ সমগ্র বিশে^ ছড়িয়ে যেতো| বাংলা সাহিত্য ভান্ডার হতো আরো সমৃদ্ধ| বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে|





















































