ফিচার এলাটিং বেলাটিং

প্রকৃতিপ্রেমী রবীন্দ্রনাথ

বাবুল কান্তি দাশ »

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বৈচিত্র্যময় শিল্প সৃষ্টি, সংগীত ও সাহিত্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজও বাঙালির জীবনের অনেকটা জুড়ে রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নানাভাবে বাঙালির জীবনকে সমৃদ্ধ করছে। বিশ্বকবির সৃষ্টির পথ ধরেই বাঙালি ও বাংলাভাষীরা বিশ্ব সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল আয়োজনে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলছেন। প্রকৃতির সাথে কবির ছিল দারুণ সখ্য। রবীন্দ্র সংগীত ও সাহিত্যের বিশাল অংশ জুড়ে প্রকৃতি। কারণ প্রকৃতি ও পুরুষ অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতির সাথে কবির যে নিবিড় সংযোগ তা আমরা কবির কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে সহজেই বুঝতে সক্ষম হবো। কবি কখনই ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে থাকতে পারতেন না। বলতেন, ‘ভালো লাগে না, আমার প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে।’ বীরভূমের বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে ওই রকম অসহ্য গরম, দুপুরবেলা চারিদিকটা রোদে হয়ত একেবারে পুড়েই যাচ্ছে – কিন্তু উনি দিব্যি দরজা জানলা খুলে এক মনে পড়েই যাচ্ছেন, তালপাতার হাত পাখাটা অবধি পাশে নেই। যদিও গ্রীষ্মের এমন দুপুর রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় – রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের বিশেষত কাকের ডাক এবং সুন্দর সুদীর্ঘ অবসর সব সুদ্ধ জড়িয়ে ওঁকে ভারি উদাস আর আকুল করে দিত। আবার হয়ত কোনো এক অবিশ্রান্ত বৃষ্টির দিনে কেউ ছুট্টে এসে ঘরের জানলা দিতে গেছেন, যদি জলে বিছনা বইপত্র সব ভিজে যায়, উনি তাতে বিরক্ত হয়ে বলেছেন – ‘আহা থাক না, জানলাটা বন্ধ করে দিলে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে আসে কী করে!’ এমনও অনেকদিন হয়েছে, যেই কালবৈশাখীর মেঘ ঘনিয়ে এসেছে আকাশ জুড়ে, বোলপুরের ওই খোলা প্রান্তরে দামাল হাওয়ার সাথে বেরিয়ে পড়েছেন। তবে গুরুদেব কিন্তু খোলা জানালার সামনে বসে একদমই লিখতে পারতেন না, লিখবার সময় জানলার কাছ থেকে দূরে সরে বসতেন – আসলে জানালা দিয়ে চলকে আসা বাইরের জগতের দৃশ্যটা ওঁকে পাগল করে দিত, নিজেকে সামলাতে পারতেন না, সব ভুলে অবিরাম তাকিয়ে থাকতেন প্রকৃতির সেই আবেদনে। খোলা জানালার কাছে বসে লিখতে পারতেন না সত্যি, তেমনি লেখার সময় জানালা বন্ধ করতেও তিনি আবার দিতেন না – জানালা থাকবে খোলা, প্রয়োজনে তিনি লেখার টেবিলটাকে সরিয়ে নিতেন। এমন জানালা খোলা রাখার কারণ মনে হয় বাইরের জগতের একটা জীবন্ত প্রভাব ওঁর সমস্ত মুক্ত দ্বার দিয়ে যাতে অবাধে প্রবেশ করতে পারে – যাতে আলোতে আকাশে বাতাসে শব্দে গন্ধে সবুজহিল্লোলে ওঁর মনের নেশায় মিশে অনেক রকম গল্প তৈরি হয়ে উঠতে পারে। তিনি নিজেই বলছেন, ‘চতুর্দিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে গিয়ে নিজের মনের মতো একটা কিছু রচনা করে যাওয়ার যে সুখ তেমন সুখ জগতে খুব অল্পই আছে।’ আলিপুর বাড়িতে যে ঘরে থাকতেন তার জানালা ছিল পুবের দিকে – ঠিক সামনে অনেকগুলো পাম গাছ, তারপর খোলা মাঠ, পিছনে বট অশোক আর অন্য সব গাছ। তিনি লেখার সময় প্রতিবারই টেবিলটাকে ঘুরিয়ে জানালার দিকে পিছন ফিরে বসতেন। বরানগর বাড়িতে থাকার সময়তেও টেবিলটা জানালার কাছ থেকে সরিয়ে রাখতেন এক কোণে যেখানে দুপাশে দেয়াল, কোনোদিকে দেখা যায় না। একই ঘটনা শান্তিনিকেতনের অতিথিশালা, প্রান্তিক, শ্যামলী, উদিচী বাড়িতেও ঘটেছে। বলতেন, ‘খোলা জানালার কাছে বসলে আর আমার লেখা হবে না। আমার মন ঘুরে বেড়াবে ঐ বাইরে দূরে।’ যখন কাজ কর্ম সব ফুরিয়ে যেত, তখন জানালার সামনে ইজিচেয়ারে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যখন অতিথিশালায় দোতলার পুবের ঘরটিতে থাকতেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে খোলা বারান্দায় গিয়ে বসতেন। ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে উঠত। হয়ত রাত এগারোটা বারোটা বেজে যেত তখনও উনি একই ভাবে আত্ম নিমগ্ন হয়ে বসে থাকতেন সেখানে। আবার ভোর চারটের সময় উঠে স্নান করতেন প্রতিদিন, তারপর পুবদিকে মুখ করে ধ্যানে বসতেন। কোনো কোনো দিন অন্ধকার থাকতেই মন্দিরের পুব দিকের চাতালে এসে বসেছেন, চোখ বুজে ধ্যান করেছেন। দু-চার জন লোকও আসতেন ঊষার পবিত্র ধ্বনির মাঝে ঋষি কবির পা স্পর্শ করে প্রণামের জন্য। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে হয়ত কিছু বললেন তাদের। ‘শান্তিনিকেতন’ নামক বইয়ের অনেক ব্যাখ্যান এইভাবে মুখে মুখে বলা। সেই কোন ছোটবেলায় পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভোর রাতে তুলে স্নান করিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করাতেন। সারা জীবন সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি, শুধু রোগশয্যায় যে কয়েকদিন অজ্ঞান হয়ে ছিলেন সে কটি দিন ছাড়া। অসুস্থতার মধ্যেও অপেক্ষা করতেন কখন ভোর হবে। যাতে প্রথম সূর্যের আলো মুখে পড়ে। তাই যে বাড়িতে থাকতেন পছন্দ করতেন পুবদিকের ঘর। জানলা বন্ধ করতে দিতেন না। শেষের দিকে ঘরে এয়ার কান্ডিশনার চলত বলে জানলা বন্ধ করে রাখা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। মাঝ রাত থেকেই বার বার বলতেন, ভোর হোলো, আমাকে উঠিয়ে দাও, স্নান করিয়ে দাও। বলতেন, ‘শেষ রাত্রে উঠে রোজ চেষ্টা করি নিজের ছোট আমির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে বড় আমির মধ্যে আপনাকে বিলিয়ে দিতে। পারিনে তা নয়, কিন্তু একটু সময় লাগে।’ যারা দেখাশোনা করতেন তারা হয়ত বলেছেন, ক্লান্ত শরীরের আরেকটু শুয়ে থাকলে ভাল হয়। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘দেখেছি যে শেষরাত্রে যখন চারিদিক নিস্তব্ধ তখন এটা সহজ হয়। তাই ঘুমিয়ে এ সময়টা ব্যর্থ করতে ইচ্ছা হয় না।’

---------