ফিচার এলাটিং বেলাটিং

লিলিন

আখতারুল ইসলাম »

ক্লোন মানুুষ লিলিন। যার কোষ থেকে লিলিনের জন্ম সে মারা গেল গত দু’দিন হল। বংশগত কোনো ছেলে মেয়ে তার ছিল না। ফলে এই ক্লোন লিলিনই তার বংশ রক্ষার একমাত্র মানুষ। লিলিন অন্য সকল স্বাভাবিক মানুষের মতো আচার-আচারণে অভ্যস্থ।
লিলিনের বয়স পনেরো বছর। স্কুলে পড়ালেখা করে। তার একমাত্র বন্ধু বলতেই পিটার। পিটার ও ক্লোন মানব। দু’জনের ভাব খুব বেশি।
পিটার বলল, লিলিন তোমাকে অভিনন্দন।
কেনো?
কারণ, তুমি এখনো তোমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছ।
আমি তো অনেক দায়িত্বই পালন করি, তুমি স্পেশাল কোন দায়িত্বের কথা বলছ আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।
“কেনো তোমার মনে নেই, যে দিন তুমি প্রথম স্কুলে এলে তোমার বাবা, তোমাকে বলেছিল, পৃথিবীতে তুমি অনেক কিছু শিখবে। যা তোমার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে।
কিন্তু কারো ক্ষতি তুমি করবে না।”
হ্যাঁ । মনে পড়েছে। আমি কারো ক্ষতি করবো না। কিন্তু কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করে তখন কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।
কেনো?
লিলিন বলল, গতকাল বাসায় আমাকে ডরিস একটা ধাক্কা দিয়েছিল। আমি পড়ে গিয়ে খুব ব্যাথা পেয়েছিলাম, অথচ ডরিসকে আমি কিছু বলিনি। তুমি হলে কী করতে?
আমিও তাই করতাম তুমি যা করেছ।
কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হল অন্য জায়গায়। আমার বাবা মানে, যার কোষ থেকে আমার জন্ম তিনি যে সম্পত্তি রেখে গেছেন। ওনার আর কেউ না থাকায় সব সম্পত্তি আমার নামে লিখে দেয়। ডরিসের বাবা, মানে আমার চাচা রেনাস চাচ্ছে আমার সে সম্পত্তি ওনার নামে করে নিতে। আমার ক্লোন বাবার কোন মানব সন্তান না থাকায় আমার জন্ম হয় ওনার জনন কোষ থেকে। সে সূত্রে ওনার সব সম্পত্তি তিনি আমারই প্রাপ্য। তাতে সমস্যা শুরু। মানুষ যে কত হিংস্র। ভয়ানক। যে কোনো সময় মেরেই ফেলতে পারে । আমাকে এভাবে যদি আমি আক্রমণ করে । বা এভাবে আমি আক্রমণের স্বীকার হই তখন কী করব?
তুমি কি এমন কোনো সমস্যায় পড়েছ?
হ্যাঁ, গত রাতে ডরিসের বাবা আমাকে মারতে এসেছিল। আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকি। যেই তিনি আমার গলা চেপে ধরবে ঠিক সেই মুহুর্তে আমি জেগে উঠি। তিনি কৃত্রিম এক গাল হাসি দিয়ে বলল, লিলিন তোমার কী খবর জানতে আসলাম।
তারপর?
তারপর কী? প্রতিদিন এভাবে কোনো না কোনো হামলার স্বীকার হচ্ছি, জানি না কোন দিন মারা যাব।
পিটার বলল, মারা যাবে না। ওদের থেকে রক্ষার একটা বুদ্ধি আবিষ্কার করতে হবে।
কীভাবে?
আমার বন্ধু, টাটেন। ও তো মঙ্গল গ্রহের অধিবাসী। গতকাল সে পৃথিবীতে এসেছিল। তার কাছ থেকে একটা পরামর্শ নেব।
ঠিক আছে ।
পিটার টাটেনকে ফোন দেয়।
টাটেন আসে। তার সাথে দেখা হয়। সব কথা পিটার খুলে বলে টাটেনকে। আমি, পিটার ও টাটেন বসলাম।
টাটেন বলল, এটা কোনো ব্যাপার হল।
ব্যাপার তো অবশ্যই। বরং কী করা যায় তার পরামর্শ দাও।
টাটেন বলল, তোমরা আগামী শুক্রবার মঙ্গলে আসো। দেখা যাক আমি কী করতে পারি।
দু’দিন পর লিলিন ও পিটার তাদের স্পেসশীপ চেপে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওয়না দেয়। পৌঁছে যায় ঠিকটাক মতো।
টাটেন বলল, স্বাগতম।
লিলিন বলল, দেখো আমি মহাবিপদে আছি। কী করা যায় দ্রুত করো, আমরা যে এখানে এসেছি কেউ জানে না, পৃথিবীতে।
পিটার বলল, বন্ধু দ্রুত করো। আমরা ফিরে যাবো পৃথিবীতে।
টাটেন বলল, এই দিকে এসো, আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েÑ বড় একটা গবেষণা কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে অনেকগুলো যন্ত্র। একটা যন্ত্র দেখিয়ে দিয়ে বলল, এই যন্ত্রটা তোমাকে রক্ষা করবে।
কীভাবে?
এটা তোমার সাথে থাকবে। কেউ দেখবে না। ঘাড়ের পাশে আলতো করে লাগানো থাকবে। যখন কেউ তোমাকে আক্রমণ করবে এটা একটা সংকেত দিবে। তোমার শরীরে একটা অনুভূতি হবে। আর তোমাকে স্পর্শ করলে, তার শরীরের বিদ্যুৎ শর্ট সার্কিটের মতো শর্ট করবে। ভয়ে কেউ আর তোমাকে আঘাত করবে না।
লিলিন বলল, যদি দূর থেকে আঘাত করে তখন কী করব।
এটা শরীরে থাকলে, যত বড় শক্তিশালী আঘাতই আসুক না কেন তা তোমার শরীর স্পর্শ করতে পারবে না।
পিটার বলল, এই না হলে বন্ধু।
লিলিনের মুখে তৃপ্তির একটা হাসির রেখা ফোটে ওঠে।
পৃথিবী ফিয়ে আসার পর যন্ত্রটার কার্যকারিতা শুরু হয়। লিলিন ঘুমাতে গেলে হঠাৎ ডরিস এর বাবা তাকে আঘাত করতে গেলে বিদ্যুৎ শর্টে ছিটকে পড়ে। লিলিনের ঘুম ভেঙে যায়। কী হয়েছে আপনার?
কিছু না, দরজায় ধাক্কা খেয়ে পরে গিয়েছিলাম।
ও! বলে লিলিন ফিক্ করে হেসে ফেলে। মনে মনে ভেবে নেয় এবার বুঝবে। মঙ্গলের যন্ত্রের অমঙ্গলের কাজে কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
ডরিসের বাবা রেনাস উঠে নিজ কক্ষে চলে যায়।
ঘুম আসে না লিলিনের। বিছানায় ছটফট করে। জানালা দিয়ে দূরের তারকা নক্ষত্র দেখে। ভাবছে এভাবে কত দিন, তার চেয়ে ভালো এসব সম্পত্তিগুলো কোনো এক ক্লোন সমাজে দান করে দিলে ভালো হয়।
আজ পৃথিবীর এতো উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও এখনো মানুষ সামান্য বিষয় সম্পত্তির জন্য লোভ করে। ভাবতেই অবাক লাগে।
মনে মনে কথাগুলো বলছে, লিলিন।
কিছুক্ষণ পর পিটার আসে।
লিলিন বলল “জানিস পিটার আমরা আমাদের বন্ধুর দেশ মঙ্গলগ্রহে চলে যায়। সেখানে খুব শান্তিতে থাকতে পারব।”
ঠিক বলেছিস, লিলিন। এর জন্য টাটেনের সাথে একটু যোগাযোগ করলে ভালো হয়।
পিটার, হাতের মোবাইলটা বের করে টাটেনের উদ্দেশ্য মঙ্গল গ্রহে ফোন দেয়।
হ্যালো, টাটেন।
হ্যাঁ! কী হয়েছে পিটার?
তেমন কিছু না। ভাবছি পৃথিবীতে আমরা থাকবো না। মঙ্গলে স্থায়ীভাবে থাকবো।
টাটেন বলল, না বন্ধু মঙ্গল আর পৃথিবী দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্ভব না।
তাহলে কী হবে?
তোমাদের পৃথিবীতে থাকতে হবে। তবে একটা উপায় আছে যদি স্থায়ীভাবে মঙ্গলে থাকো, তবে আর কোনোদিন পৃথিবীতে থাকতে পারবে না। এমন সিদ্ধান্ত নিলে, মঙ্গলের রাষ্ট্র প্রধান হয়তো তা বিবেচনায় আনতে পারে।
ঠিক আছে। তুমি সেদিকে দেখো। আমরা এদিকে কী করা যায় ভেবে দেখি।
ডরিস বলল, বাবা তুমি লিলিনকে মারার চিন্তা বাদ দাও।
ডরিসের বাবা রেনাস বলল, কেন?
আমরা পৃথিবীর মানুষেরা ক্লোন মানুষ আবিষ্কার করে, আবার তাদের হত্যা করব। কেমন যেন নিজ সন্তানকে মেরে ফেলার সামিল।
ডরিস তা না, এখানে লিলিন ফ্যাক্টর না ফ্যাক্টর সম্পত্তি।
বাবা তোমার তো অনেক আছে। তা দিয়ে আর কী হবে।
না, আমার আরো চাই।
এ সম্পত্তিতে আমি একটা ক্লোন মানব তৈরির কারখানা করব। তাতে যে ক্লোন মানব উৎপাদন হবে তা মঙ্গলগ্রহের রাষ্ট্র প্রধানের সাথে চুক্তি করে, ক্লোন মানব বিক্রি করে প্রচুর আর্থিক সুবিধা পাবো। কারণ মঙ্গলগ্রহে ক্লোন মানবদের একটা কলোনী গড়ে উঠেছে। তাদের সাথে মঙ্গল গ্রহ গঠন ও উন্নয়নে কাজ করবো।
তাহলে ওকে মারার দরকার কী?
লিলিনকে বললে তো হয়, অনেকটা রেগে ডরিস বলল।
“না ওসব তুমি বুঝবে না।”
লিলিন স্কুলে যাওয়ার পথে পিটারের সাথে দেখা হয়।
বলল, পিটার কী সিদ্ধান্ত নিলি?
পিটার বলল, না এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি? তবে দু’একদিনে নিয়ে ফেলব।
বলতে বলতে ক্লাসে ঢুকে ওরা, এই স্কুলে মানুষ আর ক্লোন মানুষ সবাই এক সাথে পড়শোনা করে। স্যারের মধ্যে শুধু একজন স্যার আছে, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা। স্যারের নাম ডেবিট। অবশ্য তিনি অতিথি শিক্ষক। তিনি পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার এবং এর ভবিষ্যতে করণীয় নিয়ে পড়ান। মঙ্গলের আবহাওয়া অনেক সহনশীল। স্যার চমৎকার সব তথ্য উপাত্ত দিয়ে পড়ান। সে থেকে পিটার ও লিলিন এর খুব আগ্রহ উষ্ণ পৃথিবী থেকে শীতল মঙ্গলে জীবন-যাপন সহজ হবে।
স্কুল থেকে ফেরার পথে লিলিন বলল, পিটার আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আমি স্থায়ীভাবে মঙ্গলে চলে যাবো। পৃথিবীতে এই রুক্ষতা, হিংসা, হানাহানি, যুদ্ধ-ধ্বংস আর প্রচুর মানুষ বাড়ছে। দিন দিন পরিবেশ বিপর্যয় যে হারে বাড়ছে, ওজন স্তরের ফুটো হওয়া, উষ্ণতা বৃদ্ধি, পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়া। যে কোন সময় জীবন, মৃত্যুর আশংকা। তাই উন্নত জীবন-যাপনের জন্য মঙ্গলে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
ঠিক আছে, পিটার লিলিনকে বলল, আমিও একমত। তবে টাটেন এর সাথে কথা বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওর মতামতের উপর নির্ভর করবে। তোর যাওয়া না যাওয়া।
পিছন থেকে ডরিস দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল, জানো লিলিন ? বাবা তোমাকে মারতে চাই।
লিলিন বলল, কেনো?
পিটার তো ব্যাপারটা লিলিনকে বলেছে তবুও জানতে চায় কেনো?
ডরিস বলল, তোমার সম্পত্তি, তাতে নাকি বাবা ক্লোন মানুষ তৈরির কারখানা গড়ে তুলবে।
তা তো ভালো কথা।
ভালো না। বাবা চায়। মঙ্গল গ্রহে ক্লোন মানুষ পাঠাতে, যা মঙ্গল গ্রহের রাষ্ট্র প্রধানের সাথে চুক্তির মাধ্যম। প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হবে বাবা।
লিলিন বলল, ঠিক আছে সব সম্পত্তি ওনাকে দিয়ে দেব।
না। না। তোমার সম্পত্তি তুমি বাবাকে কেনো দিবে?
তুমি একথা বলছ! লিলিন বলল।
ডরিস বলল, আমি মানুষ। তোমরা ক্লোন মানুষ। কিন্তু আমি তোমাদের বন্ধু হতে চাই শুধু। একজন মানুষ মারা যাওয়ার আগ মুহূর্তে ক্লোন মানুষ তৈরি করে উত্তরসূরি রাখা ভালো। কিন্তু ক্লোন মানুষ তৈরির কারখানা। তা হয়তো পৃথিবী বাসীর জন্য মঙ্গল নাও হতে পারে।
আগে এক সময় পৃথিবীতে মানব ক্লোন নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানব ক্লোনিং হচ্ছে। তাই বলে কারখানা। তাও আবার পৃথিবীর কাজের জন্য না, তা হবে মঙ্গল গ্রহের জন্য। এসব আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না। লিলিন বলল, তুমি অনেক ভালো। মানবিক মানুষ।
স্কুল থেকে ফিরে লিলিন তার রুমে আবছা ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে।
ডরিসের বাবা রেনাস এলো, এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেন কী খুঁজছে। পেছনে পেছনে ডরিস আসে। বাবা না দেখে মতো দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। ডরিস দেখল, তার বাবা কী যেন করছে।
আস্তে আস্তে ডরিসের বাবা রেনাস গেল, লিলিনের কাছে। দু’হাত দিয়ে গলা স্পর্শ করতেই যন্ত্রটায় হাত লাগে। সাথে সাথে শব্দ করে ওঠে। বিদ্যুৎ শকের মত ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে মাথা ফেটে যায় রেনাসের।
ডরিস দ্রুত এসে বাবাকে তুলে। লিলিনসহ ফাস্ট এইড বক্স এনে কোনো মতো ব্যান্ডিস করে। হাসপাতালে পাঠায়। সুস্থ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে ভাবছে এমন লোভ সে আর করবে না।
লিলিন, টাটেনকে জানিয়ে দিলো। মঙ্গলে যাবার সব ব্যবস্থা করে রাখে টাটেন।
আগামীকাল চলে যাবে চিরদিনের জন্য এই পৃথিবী ছেড়ে।
লিলিন সম্পত্তির সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে ডরিসের বাবা রেনাস এর নামে লিখে দেয়।
সব গুছিয়ে রওনা হবে । ডরিস বলল, তুমি যেয়ো না।
লিলন বলল, না ডরিস । তা হয় না। ভেতর থেকে এসে ডরিসের বাবা রেনাস বলল, কী হয়েছে ডরিস।
লিলিন মঙ্গল গ্রহে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে যাচ্ছে।
রেনাস তার ভুল বুঝতে পারে। বলে, লিলিন তুমি যেয়ো না। আমার সমস্ত কর্মকাণ্ডের জন্য সরি।
পিটার দরজায় অপেক্ষা করছে দেখে ডরিস বলল পিটার এসো।
ঘরে ঢুকে পিটার বলল, চল লিলিন। সব রেডি।
ডরিসের বাবা রেনাস বলল, লিলিন যাবে না । পিটার তুমিও মঙ্গলে যাবে না। ক্লোন মানব হলেও এই পৃথিবীতে থাকবে। আমরা সবাই মিলে পৃথিবীটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলব।

---------