চট্টগ্রামে আবারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বর্ষার শুরুতেই মশার উপদ্রব এবং সেই সাথে ডেঙ্গুর এই বাড়বাড়ন্ত নগরবাসীর মনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। প্রতিবছরই এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, আর প্রতিবছরই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। কিন্তু বাস্তবে যে মশকনিধন কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যর্থ, তা বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চিরচেনা সেই সনাতন ও দায়সারা গোছের ক্রাশ প্রোগ্রাম বা ওষুধ ছিটানো যে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, তা আজ প্রমাণিত।
জনসাধারণের অভিযোগ, চসিকের মশকনিধন টিমকে অনেক এলাকাতেই ঠিকমতো দেখা যায় না। যেখানে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, সেখানেও ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, ড্রেন ও নালাগুলো পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর যে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা থাকা দরকার ছিল, চসিকের কার্যক্রমে তার চরম অভাব দৃশ্যমান। কেবল লোকদেখানো কিছু অভিযান আর জরিমানা আদায়ের মধ্যেই যেন চসিকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। একটি দায়িত্বশীল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এভাবে নগরবাসীকে মশার কামড়ের মুখে ছুড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। চসিকের এই ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে উন্মোচিত হচ্ছে চট্টগ্রামের চিকিৎসা খাতের সংকটের চিত্র । সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় বাড়ায় শয্যাসংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। সাধারণ রোগীদের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মেঝেতে কিংবা বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের কৃত্রিম সংকট এবং চড়া মূল্য। চট্টগ্রামের মতো একটি মেগাসিটিতে পর্যাপ্ত এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্ট কিট এবং রক্তের প্লাটিলেট বা সেল সেপারেটর মেশিনের ঘাটতি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো এক প্রকার অসম্ভব।
বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় চসিক এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। চসিককে শুধু লোকদেখানো মশকনিধন বাদ দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে চিরুনি অভিযান চালাতে হবে এবং ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষা করে তা কার্যকরভাবে ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে, চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ডেঙ্গু শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের মজুত নিশ্চিত করা এবং বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, মশকনিধনে ব্যর্থতা এবং চিকিৎসার অভাব—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আর একটি প্রাণও যেন অকালে ঝরে না যায়।


















































