এ মুহূর্তের সংবাদ

বিশ্বকাপের সব ইতিহাস গড়া ফাইনাল

সুপ্রভাত ডেস্ক »

মিরাকল অব বার্ন, ম্যাজিক অব পেলে এবং মেসির গৌরবোজ্জ্বল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন—ফিফা বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক ফাইনালেই তৈরি হয়েছে এমন সব ছোট ছোট স্মৃতিমধুর গল্প।

-advertise-

রোববার আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ফাইনালের আগে দেখে নেওয়া যাক এমন সব ইতিহাস গড়া শিরোপার লড়াই।

কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনো প্রথাগত ফাইনাল ম্যাচ ছিল না। বরং চার দলের চূড়ান্ত পর্বের শেষ ম্যাচ ছিল। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার জন্য ব্রাজিলের কেবল একটি ড্রয়ের প্রয়োজন ছিল। ম্যাচটি মনে রাখার মতো ছিল উরুগুয়ের জন্য। উদ্বোধনী আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ২০ বছর পর মারাকানা স্টেডিয়ামে ২ লক্ষ স্বাগতিক দর্শকের সামনে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়ে তারা। কিন্তু তার পরিবর্তে এটি ইতিহাসে একটি ‘ব্রাজিলিয়ান ট্রমা’ বা জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে জায়গা করে নেয় কেবল ব্রাজিলের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য। দৈনিক পত্রিকা মুন্দো নাটকীয়ভাবে শিরোনাম করেছিল, ‘ব্রাজিল মৃত’। অবশ্য এই কথার পেছনে কিছুটা সত্যতাও ছিল। ম্যাচ শেষে স্তব্ধ গ্যালারি থেকে লাফিয়ে পড়ে দুই সমর্থক আত্মহত্যা করেন এবং তিনজন স্ট্রোক করে মারা যান।

মাঠে উরুগুয়ের খেলোয়াড়রা স্বপ্নভঙ্গকারী হন্তারক ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন ফুটবলীয় বীর। তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন হুয়ান শিয়াফিনো ও আলসিডেস ঘিঘিয়া। সেদিন ‘লা সেলেস্তে’দের হয়ে গোল দুটি করেছিলেন তারা। ফ্রিয়াকার গোলে ব্রাজিল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর এই দুজনের গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্টেডিয়াম থেকে বহু দূরে, রেডিওতে কান পেতে রাখা এক ৯ বছর বয়সী বালক বাঁশি বাজার পর তার বাবাকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে। সে তার বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ‘কেঁদো না বাবা। আমি তোমার জন্য বিশ্বকাপ জিতব।’ তার নাম? এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যিনি পরবর্তীতে পেলে নামে পরিচিত হন।

Sport, Football, World Cup Final, 16th July 1950, Maracana Stadium, Rio de Janeiro, Brazil 1, v Uruguay 2, The Uruguay, Back row,l-r, Obdulio Varela (captain), Juan Lopez (coach), Tejera, Vazquez (trainer), Abate (trainer), Gambetta, Gonzalez, Roque Maspoli, Andrade, Kirshberg (Masseur), Front row, l-r, Alvarez (trainer), Alcides Edgardo Ghiggia, Perez, Miguez, Juan Alberto Schiaffino, Moran and Figoli (trainer), Uruguay upset predictions of an easy victory for Brazil by winning this final match of the tournament 2-1 with goals from Juan Alberto Schiaffino and Alcides Edgardo Ghiggia, in front of an estimated attendance of 200, OOO disbelieving Brazilians at the newly built Maracana Stadium, Following this defeat the superstitous Brazilians decided to change their white shirts trimmed with blue, to the now familiar yellow and green (Photo by Bob Thomas/Popperfoto via Getty Images/Getty Images)

৪ জুলাই ১৯৫৪: পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি

১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের ফাইনাল যখন শুরু হয়, তখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল—হাঙ্গেরি জিতবে কি না তা নয়, বরং তারা কত গোলে জিতবে! ফেরেঙ্ক পুসকাস, জোল্টান চিবর, নান্দর হিদেকুতি ও স্যান্ডর কোকসিসের মতো যুগান্তকারী প্রতিভাদের নিয়ে হাঙ্গেরির ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ দল টানা চার বছর অপরাজিত ছিল এবং প্রথম রাউন্ডেই এই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল। ম্যাচের প্রথম ৮ মিনিটেই যখন পুসকাস ও চিবর গোল করে হাঙ্গেরিকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্নের তীব্র বৃষ্টির দিনে জার্মানদের জন্য আরেকটি ভুলে যাওয়ার মতো দিন অপেক্ষা করছে বলেই মনে হচ্ছিল।

তবে ভেঙে পড়ার পরিবর্তে জার্মানি তৎক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়ায়। যেখানে ফ্রিটজ ওয়াল্টার ছিলেন মূল অনুপ্রেরণা। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে তারা সমতা ফিরিয়ে আনে এবং আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে ওঠে। যদিও পুসকাসের একটি বাতিল হওয়া গোল এবং হাঙ্গেরিয়ানদের দুটি শট পোস্টে না লাগলে হাঙ্গেরি আবার এগিয়ে যেতে পারত। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ৬ মিনিট বাকি, জার্মানরা তাদের রক্ষণভাগের ওপর হাঙ্গেরির চাপ কাটিয়ে একটি পাল্টা আক্রমণ চালায়। সেখান থেকে হেলমুট হাঙ্গেরির গোলরক্ষক গিউলা গ্রোসিক্সকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। অপরাজেয় হাঙ্গেরিকে হারিয়ে জার্মানি তাদের ইতিহাসের চার বিশ্বকাপ ট্রফির প্রথমটি ঘরে তোলে। যেটি ফুটবলের ইতিহাসে ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত।

৩০ জুলাই ১৯৬৬: ইংল্যান্ড ৪-২ (অতিরিক্ত সময়ে) পশ্চিম জার্মানি

নিজেদের ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে প্রায় এক লাখ দর্শক এবং তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত সমর্থক রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সামনে খেলছিল ইংল্যান্ড। পরিস্থিতিটা ছিল ঠিক ১৯৫০ সালের ব্রাজিলের মতোই—নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি। নিজেদের মাঠে আরেকটি ‘মারাকানাজো’ এড়াতে তারা মরিয়া ছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি, যারা ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রমাণ করেছিল যে তারা যেকোনো সমীকরণ উল্টে দিতে পারে।

England's World Cup 1966 victory: How the Three Lions claimed glory | Goal.com India

ম্যাচের শেষ মিনিটে ওল্ফগ্যাং ওয়েবার গোল করে স্কোরলাইন ২-২ করলে নির্ধারিত সময়ে ইংল্যান্ডের ট্রফি জেতা হয়নি। এরপর অতিরিক্ত সময়ে জিওফ হার্স্ট আরও দুটি গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। তবে অতিরিক্ত সময়ে তার করা প্রথম গোলটি (ইংল্যান্ডের ৩য় গোল) বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল হিসেবে রয়ে গেছে। তার একটি জোরালো শট ক্রসবারে লেগে গোললাইনে ড্রপ খায়। জার্মানদের মতে বল লাইনের ওপর পড়েছিল, তবে সোভিয়েত লাইন্সম্যানের মতে বল লাইন অতিক্রম করেছিল। এই জয় ইংল্যান্ডকে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দেয়। আর হার্স্ট প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেন।

২১ জুন ১৯৭০: ব্রাজিল ৪-১ ইতালি

অনেকের চোখেই মেক্সিকোতে ‘লা স্কোয়াড্রা আজুরো’র বিপক্ষে সেলেসাওদের এই জয়টি ছিল ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপের সেরা দলটির শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। ম্যাচে নামার আগে দুই দলই দুটি করে বিশ্বকাপ জিতে সমতায় ছিল। পেলের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও পুরো ব্রাজিল দলের সামষ্টিক জাদুতে ভর করে প্রথম দেশ হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ে ব্রাজিল। পেলে নিজে একটি চোখ ধাঁধানো হেডে গোল করেন এবং জাইরজিনহো ও গার্সনও গোলদাতার তালিকায় নাম লেখান। শেষ মুহূর্তে কার্লোস আলবার্তো, পেলের একটি চমৎকার পাস থেকে বল পেয়ে এক অসাধারণ দলীয় আক্রমণকে সফল পরিণতি দিয়ে ব্রাজিলকে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় নিয়ে যান। সেদিন পেলেকে মার্কিং করার কঠিন দায়িত্বে থাকা ইতালির ডিফেন্ডার টারচিসিও বার্গনিচ পরে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে আমি নিজেকে বলেছিলাম: ‘ও তো আর সবার মতো রক্ত-মাংসেরই মানুষ।’ কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।’

২৯ জুন ১৯৮৬: আর্জেন্টিনা ৩-২ পশ্চিম জার্মানি

১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ আবার মেক্সিকোতে ফিরে আসে। আরেকটি ক্লাসিক টুর্নামেন্ট উপহার পায় বিশ্ববাসী। যার সমাপ্তি ঘটেছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের মাধ্যমে। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী অনুপ্রেরণায় আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল পশ্চিম জার্মানি। জার্মানরা ১৯৮২ সালের ফাইনালে হারের দুঃখ ঘুচাতে ব্যাকুল ছিল। অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের ১ লক্ষ ১৫ হাজার দর্শকের সামনে লাতিন আমেরিকার দলটি ২-০ ব্যবধানে লিড নেয়। কিন্তু নাছোড়বান্দা জার্মানরা দেখায় কেন তাদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোনা উচিত। মাত্র ৭ মিনিটের ব্যবধানে কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে এবং রুডি ফোলার গোল করে আর্জেন্টিনার জয়ের উদযাপনে জল ঢেলে দেন।

ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ৬ মিনিট বাকি থাকতে ম্যারাডোনা তার প্রতিভার আরেকটি ঝলক দেখান। তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে হোর্হে বুরুচাগার উদ্দেশ্যে একটি নিখুঁত পাস বাড়ান। বুরুচাগা জার্মান রক্ষণভাগকে পেছনে ফেলে ছুটে গিয়ে গোলরক্ষক হ্যারাল্ড শুমাখারকে পরাস্ত করেন। ৩-২ ব্যবধানের এই জয় আলবিসেলেস্তেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেয়।

১২ জুলাই ১৯৯৮: ব্রাজিল ০-৩ ফ্রান্স

দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফ্রান্স। তাদের ইতিহাসের প্রথম ফাইনালেও পৌঁছায়। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল চারবারের চ্যাম্পিয়ন ও ম্যাচের হট ফেভারিট ব্রাজিল। নিষেধাজ্ঞা পাওয়ায় দলের অন্যতম সেরা তারকা লরেন্ট ব্লাঙ্ককে ছাড়াই মাঠে নামতে হয়েছিল ফরাসিদের। রোনালদো, রিভালদো, কাফু, বেবেতো ও রবার্তো কার্লোসদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলের বিপক্ষে  ব্লুদের কিছুটা শঙ্কিত থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। তা সত্ত্বেও ফরাসি কোচ এইমে জ্যাকেট টেকনিক্যাল লড়াইয়ে ব্রাজিলের কোচ মারিও জাগালোকে পরাস্ত করেন। আর জিনেদিন জিদান ছিলেন তার ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। জিদানের জোড়া গোল এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এমানুয়েল পেটিটের একটি গোলের ওপর ভর করে ১০ জনের ফ্রান্স অবশেষে তাদের প্রথম বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করে।

১৮ ডিসেম্বর ২০২২: আর্জেন্টিনা ৩-৩ ফ্রান্স (আর্জেন্টিনা পেনাল্টিতে ৪-২ ব্যবধানে জয়ী)

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সাম্প্রতিক ফাইনালটি ছিল সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর। ফ্রান্সের সঙ্গে এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের পর অবশেষে পেনাল্টি শুটআউটে জয় পায় আর্জেন্টিনা।

অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আলবিসেলেস্তেরা ম্যাচের ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল জয়টা কেবল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ফ্রান্সের সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপে ভিন্ন কিছু ভেবে রেখেছিলেন। মাত্র ২ মিনিটের ব্যবধানে দুর্দান্ত দুটি গোল করে তিনি ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে যা ঘটেছিল তা রূপকথাকেও হার মানায়। মেসি তার দ্বিতীয় গোল করে আর্জেন্টিনাকে আবারও ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। কিন্তু এমবাপে পেনাল্টি থেকে গোল করে আবারও সমতা ফেরান এবং স্যার জিওফ হার্স্টের পর ইতিহাসের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েন।

অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে দুই দলের সামনেই ম্যাচ জেতার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। বিশেষ করে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সেই ঐতিহাসিক সেভ। শেষ পর্যন্ত এই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের শেষ হয় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার গনজালো মন্তিয়েল শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়িয়ে নায়ক বনে যান এবং ১৯৮৬ সালের পর নিজের দেশকে এনে দেন বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।