মতামত সম্পাদকীয়

খাদ্য অনিরাপত্তা : ঝুঁকিতে জাতির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

একটি জাতির মেরুদণ্ড কেবল তার শিক্ষায় নয়, লুকিয়ে থাকে নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায়। কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যদি অবলীলায় বিষ মিশে যায়, তবে সে জাতির সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন এক চরম প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ল্যাব পরীক্ষার যে উদ্বেগজনক চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা কেবল আতঙ্কের নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মহাসংকেত। প্রতিদিন বাজার থেকে আমরা যে পুষ্টি আর স্বাস্থ্যের আশায় শাকসবজি, পানি কিংবা শিশুখাদ্য কিনে বাড়ি ফিরছি, ল্যাবের পরীক্ষায় তা বিষের আধার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
পরীক্ষার ফল বলছে, আমাদের যাপিত জীবনের সবচেয়ে মৌলিক উপাদান ‘পানি’ আজ মলমিশ্রিত জীবাণুতে সয়লাব। যেখানে নিরাপদ পানিতে ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতি শূন্য থাকার কথা, সেখানে খাগড়াছড়ি, বাগেরহাট ও দিনাজপুরের মতো এলাকায় প্রতি ১০০ মিলিলিটারে তা ৬০ থেকে ১২০ সিএফইউ পর্যন্ত মিলেছে, যা মূলত পানিতে সরাসরি মানব বর্জ্য মিশে যাওয়ার প্রমাণ। অন্যদিকে পুষ্টির প্রধান উৎস শাকসবজিতে মিলছে মাত্রাতিরিক্ত সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন নমুনায় সিসার উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুখাদ্যে সিসার উপস্থিতি। যেখানে সহনীয় মাত্রা মাত্র ০.০২ পিপিএম, সেখানে পাওয়া গেছে ০.০৫ থেকে ০.০৭ পিপিএম। একটি শিশু যখন তার বিকাশের শুরুতেই এই বিষাক্ত ধাতু গ্রহণ করে, তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ থমকে যায়, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা লোপ পায় এবং এক বন্ধ্যা ও বিকারগ্রস্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ উন্মুক্ত হয়।
দূষণ ও ভেজালের এই ব্যাপ্তি শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন দেশব্যাপী একটি কাঠামোগত ব্যাধি। সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড় ও জিলাপিতে নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, দুগ্ধজাত পণ্যে মানহীন ফ্যাট এবং শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে পথের খাবারে ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ও ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ চেইনটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামহীন বিষক্রিয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার অকেজো হওয়া, হৃদরোগ ও অকাল মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ব্যাধি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিএফএসএ কর্তৃপক্ষ আইনি অভিযান, জরিমানা ও যৌথ নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে—তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা কিংবা মৌসুমী অভিযানে এই চক্রকে থামানো সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত দুর্বল তদারকি এবং অতি মুনাফালোভী এক শ্রেণীর সিন্ডিকেটের সীমাহীন লোভ ও দায়হীনতা।
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া আর মানুষকে ধীরে ধীরে হত্যার মধ্যে কোনো তফাত নেই। এটি একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা কেবল একটি অকর্মণ্য ও রুগ্‌ণ জাতিতে পরিণত হব। এখনই সময় দেশের প্রতিটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, উৎপাদন পর্যায় ও বাজারে কঠোর বৈজ্ঞানিক নজরদারি নিশ্চিত করা। অপরাধীদের শুধু জরিমানা নয়, দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সাথে ভোক্তাদের সচেতনতা ও উৎপাদনকারীদের নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। এই অধিকারে আঘাতকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

-advertise-