চট্টগ্রামে বর্ষার বৃষ্টি থামার পরপরই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। মাত্র ১৭ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩১ জন। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে কিংবা বর্ষণ-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার প্রজনন বাড়ে, যার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। বৃষ্টি থামতেই মশার লার্ভা জমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টির পর জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার উর্বর প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, ছাদবাগান কিংবা বাসাবাড়ির ফুলের টবে জমে থাকা পানি সময়মতো পরিষ্কার না করায় মশার বংশবিস্তার দ্রুততর হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর বর্তমান ধরনটি আগের চেয়ে বেশ জটিল। আক্রান্তদের অনেকেরই প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং জটিল উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুর এই বিস্তারকে যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে আগামী দিনগুলোতে চট্টগ্রামের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হবে।
এই সংকট উত্তরণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং স্বাস্থ্য বিভাগের দ্বিমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। মশক নিধনে কেবল নামমাত্র ওষুধ ছিটানো বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করলেই চলবে না; কোন এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি, তা চিহ্নিত করে ‘হটস্পট’ ভিত্তিক চিরুনি অভিযান চালাতে হবে। ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশা মারার পাশাপাশি ড্রেন ও নালা-নর্দমায় লার্ভিসাইড বা মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ নিয়মিত প্রয়োগ করা প্রয়োজন। একই সাথে, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, ফ্লুইড ও প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
তবে প্রশাসনের প্রচেষ্টাই ডেঙ্গু দমনের জন্য যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের সক্রিয় সচেতনতা। নগরবাসীকে বুঝতে হবে, এডিস মশা মূলত ঘরের ভেতরে বা চারপাশের পরিষ্কার জমা পানিতে বংশবৃদ্ধি করে। তাই প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার নিজের ঘর ও আঙিনা পরীক্ষা করে জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। ‘থ্রি-ডি’ ফর্মুলা (ড্রেন, ড্রপ, ডিফেন্ড) মেনে চলে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে।
চট্টগ্রামের এই ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি, তবে শৈথিল্য দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। মশা নিধনে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং জনগণের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল এই ডেঙ্গুর চোখরাঙানি থেকে বন্দরনগরীকে রক্ষা করা সম্ভব। প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং নাগরিক সচেতনতার মেলবন্ধনেই ডেঙ্গুমুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এখনই চাই সমন্বিত প্রতিরোধ
বৃষ্টি থামতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ
সুপ্রভাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দিন আগেও প্রায় ফাঁকা থাকা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড এখন রোগীতে পরিপূর্ণ হওয়ার পথে। চিকিৎসকদের মতে, বর্ষা দীর্ঘ হলে সংক্রমণের গতি আরও বাড়তে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫২৯ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম ১৭ দিনেই শনাক্ত হয়েছেন ২৩১ জন, যা বছরের আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলতি মাসের ৬ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৪ জন। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

















































