এ মুহূর্তের সংবাদ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রতি বছরই এ দেশের নদীবিধৌত জনপদগুলোতে বন্যা আঘাত হানে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্যার যে তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও পৌনঃপুনিকতা আমরা লক্ষ্য করছি, তা এক ভয়াবহ সংকটের রূপ নিয়েছে। চলতি বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আউশ, আমন আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি এবং মৎস্য ঘেরের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে, তা কেবল গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডকেই ভেঙে দেয়নি, বরং গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মহাসংকটে সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় পড়েছেন আমাদের দেশের মেহনতি কৃষকেরা, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের সতেরো কোটি মানুষের অন্ন জোগান।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এটি কেবল একটি প্রবাদ নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অমোঘ বাস্তব সত্য। বন্যাপরবর্তী সময়ে কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা চরমে পৌঁছায়। একদিকে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার মতো পুঁজির তীব্র অভাব তাদের জীবনকে এক অন্ধকার চোরাবালিতে ঠেলে দেয়। অনেক কৃষক ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন; ফসল ডুবে যাওয়ায় এখন তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধের চিন্তায় দিশেহারা। এই অবস্থায় যদি রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের পাশে এসে না দাঁড়ায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে, যা পরোক্ষভাবে শহরের বাজারব্যবস্থা এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। জরুরি ভিত্তিতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে তাদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। এই প্রণোদনা যেন কোনোভাবেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না পড়ে বা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল ও বন্যা-সহনশীল ধানের বীজ, সার, কীটনাশক এবং আধুনিক কৃষি উপকরণ বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি, কৃষি ঋণের কিস্তি আদায় সাময়িকভাবে স্থগিত করা এবং নতুন করে বিনাসুদে বা নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকল্পনার দিকেও নজর দিতে হবে। আকস্মিক বন্যা ও নোনা পানির অনুপ্রবেশ মোকাবিলা করতে পারে—এমন জাতের ফসলের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ বাড়াতে হবে। কৃষি বীমার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ দেশব্যাপী চালু করা এখন সময়ের দাবি, যাতে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকেরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।
দেশের কৃষক সমাজকে অবহেলায় রেখে বা তাদের এই বিপর্যয়ে একা ছেড়ে দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তারা এ দেশের প্রাণশক্তি। কৃষকদের এই দুর্দিনে সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সমাজের বিত্তবান শ্রেণীসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে কার্যকর ও দৃশ্যমান প্রণোদনার ব্যবস্থা করে কৃষকদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনা এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখাই হোক আমাদের প্রধান অঙ্গীকার। মনে রাখতে হবে প্রায় আঠার কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন একটি কাজ।
-advertise-