হঠাৎ

প্রসেনজিত চক্রবর্তী »

গল্পটা ছিল শাশ্বত আর অরুণিমার।
শাশ্বত ছোটো থেকেই অনাথ, কাকার ফ্যামিলিতেই তার বেড়ে ওঠা। মা-বাবার আদর, শাসন সে পায়নি ছোটো থেকে। তাই স্বভাবতই একটু বাউন্ডুলে টাইপের। সারাদিন এদিক-সেদিক করে ঘুরে বেড়াত, বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে সিগারেট খেত। ফটোগ্রাফির শখ ছিল শাশ্বতর। তাই ক্যামেরা হাতে ফুল, লতাপাতা হাবিজাবি অনেক ছবি তুলতো। টুকটাক ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও করতো।
সময়টা ছিল ২০১৫ সালের মার্চের ১১ তারিখ, শাশ্বত একটা বিয়ের ভেন্যুতে ফটোগ্রাফিতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল এন্ট্রি গেইটের দিকে। হলুদ শাড়িপরা একটি মেয়ে, কানে গোঁজা শুভ্র জারবেরা আর কপালে টিপ। মেয়েটির হাসি দেখে শাশ্বত কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার চোখ আটকে রইলো মেয়েটির দিকে। শাশ্বত খুব করে চাইছিল মেয়েটির সাথে কথা বলতে কিন্তু সে সুযোগ তার হচ্ছিল না কিছুতেই। তবে বেশ কায়দা করে মেয়েটির একখানা ছবি সে তুলে রেখেছিল।
এক তৃষ্ণার্ত হৃদয় নিয়ে শাশ্বত বাসায় ফিরে গেল। সে রাতে তার আর ঘুম হয়নি। চোখ বুজলেই সেই কালো হরিণ চোখ আর মায়াবী হাসি তার বুকের ভেতর তিরের মত বিঁধে যাচ্ছিল। চেয়ারে বসে টেবিলল্যাম্পের আলো অন-অফ করতে করতে মেয়েটির ছবি দেখে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দিল। পরের কয়েকটা দিন শাশ্বতর চোখজোড়া সেই মায়াবীকে খুঁজতেই ব্যস্ত ছিল।
১৫ মার্চ, দুপুর ১টা নাগাদ শাশ্বতর মোবাইলে নোটিফিকেশন আসলো কেউ একজন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। কিন্তু শাশ্বত রিকুয়েস্ট চেক করার আগেই রিকুয়েস্ট ডিলেট করে দেয়া হয়। শাশ্বত নোটিফিকেশন বারে আইডি নামটি দেখলো অরুণিমা। শাশ্বত বেশ কৌতূহলী হয়ে আইডিটা সার্চ করলো। প্রোফাইলের ছবি দেখার পর গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে এক পশলা বৃষ্টির মতো শীতলতা শাশ্বতর মনকে স্পর্শ করে গেল। এতদিনে তার তৃষ্ণার্ত চোখের পিপাসা মিটলো। অনেকটা মেঘ না চাইতেই জলের মত সে অরুণিমাকে খুঁজে পেলো। বুকভর্তি আশা নিয়ে সে অরুণিমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে দিলো। অতঃপর শুরু হলো চাতকের মতো অপেক্ষা। তবে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না, তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অরুণিমা তার রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করে নিলো। শাশ্বতর ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা ভেসে উঠলো। খানিকটা সাহস সঞ্চার করে অরুণিমাকে ম্যাসেজ করলো কেমন আছেন? বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও ওপার থেকে কোনো রিপ্লাই এলো না। শাশ্বত কিছুটা আশাহত হলো বটে। অরুণিমার যে ছবিটি সে তুলেছিল সেটি অরুণিমার ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর ছবিতে লাভ রিয়েক্ট, ওপার থেকে অরুণিমার ম্যাসেজÑ ছবিটি বেশ সুন্দর হয়েছে, ধন্যবাদ। শাশ্বতর মরুভূমির ন্যায় মনে অরুণিমার ম্যাসেজ প্রশান্তির বৃষ্টি হয়ে এলো। সময় যত যাচ্ছিল ততই দুজনের কথা বলার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছিল। শাশ্বত-অরুণিমা ১৮ তারিখ দেখা করার প্ল্যান করলো। অরুণিমার বাবা ছিলো সরকারি চাকরিজীবী। হঠাৎ করেই তার বাবার ট্রান্সফারের নোটিশ চলে আসলো। দুর্ভাগ্যবশত শাশ্বত আর অরুণিমার দেখা করা হয়ে ওঠেনি। ১৮ তারিখ সকালে অরুণিমার পরিবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুজনের ভীষণ মনখারাপ হলো দেখা করতে না পারাতে।
দুজনই রাত জেগে কথা বলতে শুরু করল। রোজ নিয়ম করে গুডনাইট, গুডমর্নিং ম্যাসেজ দেওয়া, একে অপরের ছোটেখাটো বিষয়গুলোতে কেয়ার করাÑ এসব করতে করতে তাদের মধ্যে অদৃশ্য আবেগ-অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছিল। শাশ্বতর বুঝতে বাকি রইলো না, সে অরুণিমার মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছে। ভালোবেসে ফেলেছে সে অরুণিমাকে। অরুণিমার ম্যাসেজ দেখে শাশ্বত বুঝতে পেরেছিল অরুণিমারও তাকে ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লাগা এবং ভালোবাসার মধ্যবর্তী দূরত্বটা সে আন্দাজ করতে পারছিল না।
এবার শাশ্বত সাহস করে অরুণিমাকে বলে বসলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ভয়ে সাহস করে বলা হয়নি। ম্যাসেজ সিন হলো, কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। শাশ্বতর অনুশোচনা হচ্ছিল ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে হয়তো সে এত সুন্দর একটা বন্ধুত্ব নষ্ট করে ফেললো। ঘণ্টাখানেক পর অরুণিমার উত্তর এলো, আমিও তোমাকে ভালোবাসি, শাশ্বত।
২০১৬-এর শুরুর দিকে অরুণিমার বাবা বদলি হয়ে গেল কিশোরগঞ্জ। শাশ্বত-অরুণিমার দেখা করার আশা শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। দেখতে দেখতে পরপর দুটি বছর কেটে গেল। দুবছরে কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি, হাতে হাত রেখে পথহাঁটা হয়নি। পরপর দুবছর শীত কেটে গেলেও চাদর জড়িয়ে উষ্ণতা ভাগাভাগি করা হয়নি।
অরুণিমা স্বভাবতই বেশ রাগী এবং অভিমানী। শাশ্বত সব বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করতো। ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয় তার উদাহরণ শাশ্বত নিজেই। একটা অগোছালো বাউন্ডুলে স্বভাবের ছেলে নিজেকে পরিবর্তন করে নিল শুধুমাত্র অরুণিমার জন্য।
২০১৭-এর আগস্ট মাসে অরুণিমা তার মা এবং দাদার সাথে চট্টগ্রাম চলে আসলো। শত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অরুণিমা এবং শাশ্বত দুর্গাপূজার অষ্টমী দিন সকালবেলা দেখা করলো। অরুণিমার পরনে নীলরঙের শাড়ি, হাতে কয়েকটি কাচের চুড়ি আর খোলা চুল। অরুণিমাকে দেখে শাশ্বতর সামনে পুরো পৃথিবী থমকে যাচ্ছিল। তার বোবা দুচোখ আটকে রইলো অরুণিমার দিকে। অরুণিমার খোলা চুলের বাতাসে শাশ্বতর সব বিষণ্নতা উড়ে যাচ্ছিল। শাশ্বত নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিল। দুই বছরের অপেক্ষার পর অরুণিমা আজ তার চোখের সামনে। সাহস করে সে অরুণিমার হাতটা ধরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল। অরুণিমার কপালে চুমু এঁকে দিল। প্রথম চুম্বন আর জড়িয়ে ধরার অনুভূতি পুঁজি করে বেশ ভালোই দিন কাটছিল।
এভাবে পেরিয়ে গেল বছর পাঁচেক। শাশ্বত গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরির দৌড়ে নেমেছে সবেমাত্র। অরুণিমা তখন অনার্স ৩য়বর্ষের ছাত্রী। ঠিক তখনই ঘটলো সবচেয়ে বড় অঘটন। হঠাৎ অরুণিমার বাবা পরলোকগমন করলেন। অরুণিমা ভীষণভাবে ভেঙে পড়লো। শাশ্বত অরুণিমাকে মানসিকভাবে স্থির রাখতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো।
অনাকাক্সিক্ষত এই বিপর্যয়ের বছর পেরোতে না পেরোতেই অরুণিমার বাসা থেকে তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করলো। অরুণিমা শাশ্বতকে এ কথা জানাতেই শাশ্বত মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয় পড়ল। শাশ্বতর মা-বাবা না থাকায় পারিবারিক সার্পোটটা তার ছিল না। সবেমাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা বেকার ছেলেটি বুঝে উঠতে পারছিল না কীভাবে তার ভালোবাসাকে আগলে রাখবে। অরুণিমা সিদ্ধান্ত নেয় তার বাসায় শাশ্বতর কথা জানাবে। সবটা জানার পর অরুণিমার মা-দাদা শাশ্বত বেকার হওয়াতে তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি হল না।
শাশ্বত শত চেষ্টার পরও ন্যূনতম বেতনের একটা চাকরি জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিল। অরুণিমাও কিছুতেই তার মা-দাদাকে রাজি করাতে পারছিল না। অরুণিমার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেল। শাশ্বত অসহায়ভাবে তার ভালোবাসাকে হারিয়ে যেতে দেখলো। শাশ্বত অরুণিমাকে শেষবারের মতো দেখার ইচ্ছে ব্যক্ত করলো, প্রথম দিনের মতো নীলশাড়িতে। অরুণিমা নীল শাড়ি পরে শাশ্বতর সামনে এসে দাঁড়ালো। তবে এবার দুজনের চোখেমুখে বিষণ্নতার ছাপ। বিষণ্নতার বাতাসে বুক ভারী হয়ে উঠছিা দুজনেরই। শাশ্বত অরুণিমার কানে একটা শুভ্র জারবেরা গুঁজে দিয়ে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললো
শাশ্বত : ভালো থেকো অরুণিমা।
অরুণিমা : তুমি আমাকে ছাড়া ভালোই থাকবে, বলো?
শাশ্বত : সেটা না হয় আমার উপরেই ছেড়ে দাও।
অরুণিমার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। শাশ্বত মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছে নিল। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। শেষবারের মতো দুজন দুজনকে বিদায় জানিয়ে দিলো।
অরুণিমার বিয়ে হয়ে গেল।
বছর পাঁচেক পেরিয়ে গেল। শাশ্বত এখন বেশ নামকরা একজন ফটোগ্রাফার। চারিদিকে তার কাজের বেশ সুনাম। নিজের ওয়েডিং ফটোগ্রাফির টিমও তৈরি করেছে। মাস শেষে ভালো টাকা ইনকাম তার। অরুণিমাকে এখনো সে ভুলতে পারেনি। অরুণিমার ছবি এখনো যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মাঝেমাঝে ছবিটা নিয়ে বসে পড়ে আর অতীতের স্মৃতিচারণ করে। এই পাঁচ বছরে দুজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
বিয়ের ইভেন্ট কাভার করতে শাশ্বত ঢাকা যাচ্ছিল। রাত ১২টার ট্রেন। শাশ্বত ট্রেনে উঠে ব্যাগপত্র রেখে সিটে বসে পড়লো। মিনিট পাঁচেক পর একজন মহিলা বাচ্চা ও হাজবেন্ডসহ সামনের সিটে এসে বসল। মেয়েটির চোখ দুটো শাশ্বতর খুব চেনা লাগছিল। শীতের সময়। চাদর মুড়ি দিয়ে রাখাতে চেহারাটা বোঝা যাচ্ছিল না। কিছু সময় পর মেয়েটি মুখ থেকে চাদর সরিয়ে নিল। শাশ্বত দেখলো অরুণিমা তার সামনে। শাশ্বতর চোখ দিয়ে তার অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ছিল। সাথে হাজবেন্ড থাকাতে অরুণিমা শাশ্বতকে কিছুটা এড়িয়ে গেল।
রাত দুটো নাগাদ যাত্রাবিরতির জন্য ট্রেন থামল স্টেশনে। অরুণিমার হাজবেন্ড খাবার আর পানি কেনার জন্য ট্রেন থেকে নামলো। দুজনের কিছুটা কথা বলার সুযোগ হলো।
অরুণিমা : কেমন আছো শাশ্বত?
শাশ্বত : ভালো থাকতে চাই, তবুও ভালো থাকাটা হয়ে ওঠে না। অদৃশ্য এক শূন্যতা আমাকে জড়িয়ে ফেলে বারবার।
অরুণিমা : পরিস্থিতি আর পরিবার বাধা হয়ে না দাঁড়ালে আজ আমাদের গল্পটা অন্যরকম হতো। বিয়ে করেছ নিশ্চয়ই?
শাশ্বত : সব গল্পের সুন্দর সমাপ্তি হওয়া তো জরুরি নয়। কিছু গল্প অপূর্ণ থাকলেই ভালো। গল্পের সূচনাতে তো তুমি ছিলে, সেই সুখকর সূচনার স্মৃতিচারণ করে জীবনটা দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছি। তবে তোমাকে না পাওয়ার আফসোস আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে আজও। বিয়ে! হা হা হা … তোমাকে হারিয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তারপর ভালোবাসা নামক শব্দটার প্রতি ভীষণ ভয় লাগে।
দীর্ঘশ্বাসে বুক ভারী হয়ে উঠছিল দুজনের। দুজন মুখোমুখি থাকলেও হাত ধরার অধিকার নেই। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে হৃৎস্পন্দন শোনানোর অধিকার নেই। অদৃশ্য বলয় দুজনকে আলাদা করে রেখেছে। যে বলয় ভেদ করার সাধ্য দুজনের কারোরই নেই।
শাশ্বতর প্রাপ্তির খাতায় অরুণিমা শূন্যতা হয়ে রয়ে গেল আজীবন।