সামছুল আলম শিমুল »
মায়ের সঙ্গে খালাবাড়ি থেকে ট্রেনে ফিরছিল ইতি। জানালার বাইরে ছুটে চলা সবুজ মাঠ দেখতে দেখতে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল পাশের সিটে বসা একটি ছোট্ট মেয়ের কোলে।
মেয়েটির হাতে ছিল একটি পুতুল। এমন সুন্দর পুতুল ইতি আগে কখনো দেখেনি। গায়ের রং ভোরের রোদের মতো কোমল লালচে-ফর্সা। বড় বড় কালো চোখে যেন প্রাণ লুকিয়ে আছে। গোলাপি ঠোঁটে মিষ্টি হাসির আভাস, ভরাট গালে ছোট্ট টোল। পরনে আকাশি-নীল ফ্রক, সোনালি চুল দুটো ঝুটি করে বাঁধা। মনে হচ্ছিল, এ যেন পুতুল নয়, চুপচাপ বসে থাকা একটি মিষ্টি খুকি।
ইতির ভীষণ ইচ্ছে করছিল পুতুলটাকে একবার কোলে নিতে। কিন্তু মায়ের শেখানো কথা মনে পড়ল- অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া ধরা ঠিক নয়। তাই সে শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
কয়েকটি স্টেশন পর মেয়েটি নেমে গেল। পুতুলটাও চলে গেল তার সঙ্গে। ট্রেন আবার ছুটতে শুরু করল, কিন্তু ইতির মনটা যেন সেখানেই রয়ে গেল। চোখ ভিজে এল। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেরই লজ্জা লাগল। সে তো এখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। এত বড় হয়ে একটা পুতুলের জন্য মন খারাপ করা কি ঠিক?
বাড়ি ফিরেও সে পুতুলটাকে ভুলতে পারল না। কোনো পুতুল দেখলেই ট্রেনের সেই পুতুলটির কথা মনে পড়ে। মনে মনে সে শুধু ভাবত- আহা, যদি এমন একটি পুতুল তারও থাকত!
এরই মধ্যে চলে এল ইতির জন্মদিন। প্রতি বছর নিউইয়র্কে থাকা মেজ মামা তার জন্য বড় একটি বাক্সভর্তি বিদেশি চকলেট পাঠান। কিন্তু এবার জন্মদিন কেটে গেলেও বাক্স এল না। ইতি ভেবেছিল, হয়তো মামা খুব ব্যস্ত ছিলেন। একটু মন খারাপ হলেও সে কিছু বলল না।
প্রায় দুই মাস পর এক রাতে মা একটি বড় পার্সেল এনে বললেন,
-তোর মেজ মামা পাঠিয়েছে। কুরিয়ারের ঝামেলায় এতদিন আটকে ছিল।
ইতির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি পার্সেল খুলে দেখল, ভেতরে একটি বড় বাক্স। হাতে নিয়েই তার মনে হলো, অন্যবারের চেয়ে বাক্সটা যেন অনেক বেশি ভারী।
সে খুশি হয়ে বলল,
ইস! এবার নিশ্চয়ই অনেক অনেক চকলেট পাঠিয়েছে!
ঢাকনা খুলতেই ওপরে দেখা গেল তার প্রিয় সব বিদেশি চকলেট। আনন্দে একে একে চকলেটগুলো তুলতে লাগল।
হঠাৎ তার হাত থেমে গেল।
চকলেটের নিচে রাখা একটি ছোট্ট সুন্দর বাক্স।
বাক্সটির গায়ে একটি ছোট্ট চিরকুট লাগানো।
ইতি চিরকুটটি খুলে পড়ল-
‘আমার আদরের ইতির জন্য।
এবার ভাবলাম, শুধু চকলেট নয়- এমন একজন ছোট্ট বন্ধু পাঠাই, যে সব সময় তোমার পাশে থাকবে।
ভালোবাসা রইল।
তোমার মেজ মামা’
চিরকুটটা পড়ে ইতি ছোট্ট বাক্সটির ঢাকনা খুলল।
পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এ তো সেই পুতুল! মুহূর্তেই ট্রেনের সেই বিকেল আর নীল ফ্রকের পুতুলটির কথা তার মনে ভেসে উঠল। কাঁপা হাতে পুতুলটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল ইতি । আনন্দে তার চোখ ভিজে উঠল।
মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের চোখের জল আর মুখের হাসিই যেন সব কথা বলে দিচ্ছিল। মা মৃদু হেসে বললেন, -কী আশ্চর্য! মনে হচ্ছে, পুতুলটা যেন তুই অনেক আগে থেকেই চিনতিস! ইতি কিছু বলল না। শুধু আরও শক্ত করে পুতুলটাকে বুকে চেপে ধরল।
সেদিন থেকে পুতুলটার জায়গা হলো তার পড়ার টেবিলের পাশে। পড়তে পড়তে ক্লান্ত লাগলে ইতি একবার পুতুলটার দিকে তাকায়। তখন তার মনে হয়, ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্নগুলো হয়তো কখনো হারিয়ে যায় না। সময় নিয়ে হলেও তারা একদিন ঠিকই আমাদের কাছে ফিরে আসে।



















































