অরূপ পালিত »
নানা গড়িমসিতে বিকেল গড়িয়ে দাফন শেষ হতেই, আকাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝুপঝুপ বৃষ্টি শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, মেঘগুলোও আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারেনি। লোকজন বলাবলি করছিল, ভালো বলে প্রকৃতিও আজ কাঁদছে। আষাঢ়ের শেষ, পশ্চিম আকাশজুড়ে টুকরো টুকরো হয়ে জমে থাকা মেঘগুলো যেন কোনো অদৃশ্য শোক বয়ে বেড়াচ্ছিল। বাতাসে কদম ফুলের মিষ্টি গন্ধ। স্নিগ্ধ বাতাসে বলে দিচ্ছে দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘের ফাঁকে অন্ধকারের নিস্তেজ আলোতে একাকী নীলার স্টেশনে যাত্রা। রাতের শেষ ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর স্টেশনের চারপাশটা ফাঁকা। ক্লান্ত ছিন্নমূল মানুষগুলো কয়েকজন একত্রে হয়ে ঘুমিয়ে গেছে। কয়েকটি কুকুর মানবতার চোখ নিয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চগুলোতে বসতে কষ্ট হচ্ছে। পায়ের কাছে পড়ে আছে ভেজা ছেঁড়া কাগজ আর কয়েকটা প্লাস্টিকের কাপ। নিজেকে নিচে পড়ে থাকা কাগজ ও প্লাস্টিকের কাপের চেয়ে মূল্যহীন লাগছে নীলার। নিকট দূরত্বে পড়ে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটের আগুন এখনো নেভেনি। ভেজা চোখদুটো শুকনো হতে চাইলেও পারছিল না। কয়েক দিন আগেও যে মানুষটা জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ছিল, সেই মানুষটাকে আজীবনের জন্য কদম গাছের নিচে সাদা কাপড় মুড়ে স্যাঁতসেঁতে মাটির নিচে ঘুমিয়ে রেখে যেতে হচ্ছে।
দূর থেকে ভেসে আসা কদম ফুলের গন্ধে নীলার মনে একের পর এক স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে। ঢাকা থেকে ফেরার পথে এই রাজাপুর স্টেশনে একা বসেছিল নীলা। রাত গভীর হওয়ায় বাড়িতে যেতে একা ভয় হচ্ছিল। শেষ ট্রেনে ভার্সিটি থেকে এসেছিল আরিফ। ছাতা ছাড়া বৃষ্টিতে বের হতে পারছিল না। রাত যত গভীর হচ্ছে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের দোকানগুলোর আলো নিভে যাচ্ছে। চারপাশে নেমে আসছে নিস্তব্ধতার পর্দা। ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মটিকে মনে হচ্ছে রাতের নীরবতায় নিজেকে গোলাপি আলোতে সঁপে দিচ্ছে। ভয়ে নীলা প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসা থাকা ছেলেটির পাশে গিয়ে বসে। যাতে বাইরের অযাচিত লোকগুলো বুঝতে পারে না দুজনেই অপরিচিত।
বৃষ্টি থেমে যাবার পর ছেলেটি যখন বের হচ্ছিল নীলা তার হাতটি ধরে বললো-চলো দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফিসফিস করে বলে প্লিজ আপনার সাথে আমাকে একটু নিন। দুই-তিনটি কুকুর অনেকক্ষণ ধরে আমাকে ফলো করছে। বাইরে রিকশা না থাকাতে দুজনেই হাঁটতে থাকে।
হাঁটতে-হাঁটতে নীলা জিজ্ঞেস করল,Ñ আপনি কোথায় যাবেন?
– হাইস্কুলের পাশে, মাস্টারবাড়িতে।
– আপনি কি হেডস্যারের ছেলে-আরিফ?
– হ্যাঁ ! আপনি?
– আমিও সেখানেই যাচ্ছি। স্যারের সঙ্গে দেখা করতে।
মেয়েটির কথায় রহস্যের আভাস পেয়ে আরিফ থমকে দাঁড়াল।
– রহস্য না করে বলুন তো, আসলে কোথায় যাবেন?
নীলা মুচকি হেসে বলল-
কালকে স্কুলের গুণীজন সংবর্ধনা এবং গৌরবময় পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আপনিও আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। বহু বছর পর সেই চেনা প্রাঙ্গণে আপনার আগমনÑএকজন সম্মানিত অতিথি হিসেবে। আর আমিও এসেছি, এই বিদ্যালয়েরই একসময়ের ছাত্রী হয়ে, ফিরে এসেছি আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিমাখা সেই প্রিয় আঙিনায়। সময়ের স্রোত কত কিছুই না বদলে দেয়Ñবদলে যায় মানুষ, বদলে যায় চারপাশ, মুছে যায় কত পরিচিত মুখ। অথচ কিছু স্মৃতি সময়ের কাছে হার মানে না।
ওই যে একটা রিকশা আসছে, আপনাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
ওটা আপনার জন্য নয়, আমার জন্যই আসছে। কুকুরগুলোর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। অবশ্য ওরা জানে না আমি কোন বাড়ির মেয়ে। জানলে হয়তো আমার ছায়াও মাড়াত না। কাল স্কুলের অনুষ্ঠানে দেখা হবে। রিকশা থেকে দুজন যুবক নেমে নীলাকে সালাম দিল। নীলা রিকশায় ওঠার সময় আরিফের উদ্দেশে করে বলে,
– আমি নীলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান নিয়ে পড়ি। আপনাকে আমার আরেকটি পরিচয় দিইনি। আপনি আমার আপা শীলার খুব ভালো বন্ধু..।
সেদিনের সেই পরিচয় ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে ভালোবাসায় রূপ নেয়। ঢাকায় এসে একে-অপরের সাথে যোগাযোগে সম্পর্কটি পূর্ণতা পেল। গ্রামে বেশ কয়েকবার এরা একসাথে ঢাকা থেকে আসা-যাওয়া করেছিল। আরিফের রেজাল্ট বের হলে বাইরের দেশে চলে যাবে এর মধ্যে কয়েক জায়গায় অ্যাপ্লাইও করে রেখেছে। নীলারও এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি দুজনেই বিয়ে করে ফেলায়, দুই পরিবারের কেউই এই বিয়েকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি।
একদিন প্রবল বর্ষায় আরিফ নীলাকে নিয়ে বাড়িতে এসেছিল। বাড়িতে ঢুকতে দেননি আরিফের মা। আরিফ কদম ফুল বেশ পছন্দ করতো। বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে যাবার সময় আরিফ নীলার খোঁপায় কদম ফুল গুঁজে দিয়ে বলেছিল,
– দেখেছো, নীলা? বর্ষা আর কদম একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। ঠিক আমাদের মতো।
“নীলা হেসে মাথা নিচু করেছিল”। আরিফ সবসময় এমনই ছিল। নীলা সামান্য কষ্ট পেলেই তার হাত ধরে বলত,Ñ “তুমি কখনো কাঁদবে না”। তোমার চোখে জল আমি দেখতে পারি না। আরিফ দুই পরিবারের বিচ্ছিন্ন থাকাকে নিজের হাসি দিয়ে সব কষ্ট ঢেকে দিত। কিন্তু আজ ভাগ্য যেন নিষ্ঠুরভাবে সবকিছু বদলে দিয়েছে।
আরিফের গুলিবিদ্ধ লাশটি যখন নিয়ে আসা হলো গ্রামের বাড়িতে। লাশবাহী ফিজিং অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশ দেখে মানুষজনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে এলো নীলা, তাও স্বামীর লাশ সঙ্গে নিয়ে। মাটি দিতে দিতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বৃষ্টির ফোঁটা আর চোখের জল এক হয়ে নীলার গাল বেয়ে নামছিল। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,”শব্দের মায়াজালে জড়িয়ে আমাকে কখনোই কাঁদতে দাওনি,এখন তোমার জন্য প্রতিনিয়ত আমাকে কাঁদতে হবে”!
কবরের মাটি ধীরে ধীরে সমান হয়ে গেল। একসময় সবাই চলে যেতে শুরু করল। বাড়ির লোকজনও নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কারফিউর চলছে ঢাকা শহরে। নীলা কেমন করে একা যাবে একটিবার কেউ মুখ খুলে জিজ্ঞাসা করলো না।
নীলা স্টেশনের দিকে রওনা হলো , সবুজ শ্যামল গল্লাই গ্রামের বাতাসে ভেজা কদম ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। দূরে বিদ্যুতের মৃদু আলোয় কদমগাছটা নুয়ে পড়েছে। নীলার মাথায় কে যেন আলতো করে চুমু দিল। আজকে রাজাপুর রেল স্টেশনটিতে যাবার পথ শেষও হচ্ছে না। নীলার অনুভব হচ্ছে আরিফ ওর হাতটি ধরে হাঁটছে। ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাশে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।
মানুষটাকে কতবার বলা হয়েছিল কারফিউ চলছে, বাজারে যেতে হবে না। ঘরে যা আছে, তা দিয়েই আজকের দিনটা কেটে যাবে। কিন্তু আরিফ হেসে বলেছিল, সরকার সহজেই কারফিউ তুলবে না। ”মাত্র পাঁচ মিনিট” চাল আর ডিম নিয়ে ফিরছি। সেই পাঁচ মিনিটই আর কোনোদিন শেষ হবে না। গলির মোড়ে পুলিশের সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মাথায় সে গুলিবিদ্ধ হয়। দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিল। পরে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার হাতে শক্ত করে ধরা ছিল এক ব্যাগ চাল আর কয়েকটি ডিম। সেই সামান্য বাজারের ব্যাগই যেন শেষ সাক্ষ্য হয়ে রইলÑসে রাজনীতি করতে বের হয়নি, সে শুধু পরিবারের ক্ষুধা মেটাতে বের হয়েছিল। সরকার বদলাবে, সময় বদলাবে, ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখবে। সংবাদপত্রের প্রথম পাতার শিরোনাম একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু একটি পরিবারের শূন্যতা কি কখনো পূরণ হবে? রাষ্ট্র কি কোনোদিন ফিরিয়ে দিতে পারবে একজন স্ত্রীর নির্ভরতা, একটি মায়ের সন্তান, কিংবা একটি অসমাপ্ত জীবনের সব স্বপ্ন? যে সন্তান বাবার মুখ দেখেনি তার দায়িত্ব কার?
বছর শেষ এক-বিকেলে নীলা অবুঝ মেয়েটিকে নিয়ে আরিফের কবরের কাছে গেছে সুসংবাদ দিতে। অ্যামাজনের মতো একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে আরিফের চাকরি হয়েছে। ওকে লন্ডনে গিয়ে যোগদান করতে হবে। নীলার কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে আসে। আরিফ কদমফুল ভালোবাসত বলে নীলা একটি তাজা কদম ফুল ও জয়েনিং লেটার রেখে দিল।
যে মানুষটিকে সে হারিয়েছে, তাকে আর ফিরে পাবে না। কিন্তু তার ভালোবাসাকে হারানো সম্ভব নয়। দূরে রাজাপুর রেলস্টেশনের দিকে একটি ট্রেনের দীর্ঘ বাঁশি ভেসে এলো। জীবনের মতোই ট্রেনটি থামল না, নিজের গন্তব্যে এগিয়ে চলল। নীলাও হাঁটতে শুরু করল। পেছনে একটি কবর, একটি কদমগাছ, আর শেষ বৃষ্টিতে ভেজা এক জীবনের অসমাপ্ত প্রেম। কেউ জানবে না, একটি কদম ফুলের সুবাসে কত শত স্মৃতি লুকিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃতি মনে রাখবে। প্রতি বর্ষায় কদম ফুটবে, বৃষ্টিও নামবে। আর বাতাস নিঃশব্দে বলে যাবেÑসত্যিকারের ভালোবাসার সমাপ্তি হয় না- কেবল মানুষগুলো একদিন দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যায়।





















































