পৃথুলা

দীপক বড়ুয়া »

আমি পৃথুলা।
বাবা ডাকে পৃথু। মা অন্য নামে, ববি! ববি নামটায় স্নেহমায়াভরা। আমি নাকি ভীষণ সুন্দরী। চোখ নাক কপাল চুল নখ আঙুল অপরূপে ভরপুর। সাধারণত সব গুণ একটি মেয়ের থাকে না। যেটা আমার মধ্যে আছে। কলেজের পাঠ চুকিয়ে বাংলায় অনার্স পড়ছি ভার্সিটিতে।
বাংলা আমার প্রিয় বিষয়। বাংলাকে কত্তো ভালোবাসি। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। মায়ের মুখের ভাষা বাংলা। শিশুকাল পেরুতেই মায়ের মুখের ধ্বনি শুনি। কী মিষ্টি, সুমধুর। কল্পনা করা যায়?
অনেক ছাত্র বাংলায়।
রেহেনা রীনু রীতু রিমঝিম তুলতুলি শ্রীকান্ত শরৎ আনু মেহমুদ রাহাত হায়দার প্রিয়াংশু। সবাই স্মার্ট। কথায়-কথায় কবিতা। সবাই অবলীলায় বলে। আমি পারি না। আমাকে প্রিয়াংশু ঠাট্টার ছলে বলে, পৃথুলা, তুমি বড্ডো বুদ্ধিমান।
কথাটার সঠিক অর্থ খুঁজি, পাই না। চুপ থাকি। প্রিয়াংশু আমার সাথে একটু বাড়তি কথা বলে। হয়তো আমার চলা, কথা বলা ওর খুবই পছন্দ। প্রিয়াংশু উজ্বল শ্যামলা। স্বাস্থ্যবান। ছোটো চুল। সব সময় পানজাবি পরে। নানান স্টাইলের। দারুণ মানায় পানজাবিতে ওকে। বামহাতে আরমানি স্বচ্ছ শাদারঙের ঘড়ি। অদ্ভুত ছেলেটা। ঠোঁটে সারাক্ষণ হাসি।
আমার সেলোয়ার-কামিজ পছন্দ। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি পরতে। বিশেষ অনুষ্ঠানে শাড়ি ভালো লাগে। সেদিন শাড়ি পরে ভার্সিটিতে যাই। ক্লাস ছুটিতে প্রিয়াংশু বলে, তোমার শরীরের সত্যিকার গুণটা উপলব্ধি করতে পারি না। আমি তো অবাক। ভাবি, এটা কি ধরনের প্রশ্ন। তবু কৌতূহল হয়। ফিরতি প্রশ্ন করি,
কথাটার মানে কি?
কোন কথা?
ঐ যে বললে আমার শরীরের গুণটা কি উপলব্ধি হয় না।
ও সে কথা? তুমি সেলোয়ার-কামিজ পরলে কী সুন্দর লাগে। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে কওে না। মনে হয়, জামাটা তোমার প্রতিটি অঙ্গে মিশে গেছে। সবাইকে সব ড্রেসে কি মানায়? তবু পরে। যেমন তুমি আজ শাড়ি পরেছে। অসাধারণ লাগছে। শাদা শাড়িতে নকশিকাজ। শাদা ব্লাউজ। কপালে শাদা টিপ। হাতে ধবধবে শাদা চুড়ি। যেন একটি শাদা পরি।
আমি নই, মনটা হাসে। অহংকারে ভরে যায় মন। সব মেয়ের প্রশংসা পছন্দের। সত্যিই আমি সুন্দরী! এত ছেলে, কারো চোখে পড়িনি, শুধু প্রিয়াংশুর চোখে? তাহলে আমি সুন্দরী, তা তো বলা যায় না নিঃসন্দেহে। নাকি আমাকে খুশি করার জন্যই কি প্রিয়াংশুর মুখের বুলি। যে যাই বলুক, আমি জানি, নিজে কতটা সুন্দরী। শরীরের সৌন্দর্য ঠিক রাখতে কত প্রিয় জিনিসকে বিসর্জন দিয়েছি, সে আমি জানি। প্রতিদিন ব্যায়াম করি। পরিমিত খাই। মা বলে, পৃথিবীতে সৌন্দর্যের যথার্থ দাম আছে। যত দামি কাপড় পরি না কেন, সুন্দরী অবশ্যই হতে হবে। তার ওপরে চাই স্মার্টনেস। আচরণ, ভদ্রতা, নমনীয়তা। মেপে কথা বলা।
আমার বাবা অদ্ভুত একজন মানুষ। আমি ছাড়া কিছুই বোঝে না। বাবার স্বভাব প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে সকালের পত্রিকা পড়া। তারপর হাতমুখ ধোওয়া, নাশতা করা। আজকেও তার ব্যতিক্রম নেই।
বাবা পত্রিকা পড়ছে। আমাকে দেখে বলে, আজ ভার্সিটি যাবি না?
না বাবা, আজ বন্ধ।
ও তাই বল। তুই বাংলা পড়ছিস, আমার ভীষণ ভালো লাগছে।
কেন বাবা?
জানিস মা, এই বাংলাভাষার জন্য বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এই ভাষার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি কতজন আত্মহুতি দিয়েছে। সালাম বরকত রফিক জব্বার ছিল এঁদেও মধ্যে অন্যতম। সেই আন্দোলনের ফসল আজকের এই বাংলাদেশ। রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষা। বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্ভভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়ে সাত কুটি বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধ করে এই সোনার বাংলাদেশ পেয়েছে। আজ তিনি জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃত। তুই বাংলাকে ভালোবাসিস, গর্বে আমার বুক ভরে যায়।
বাবা, বাংলা আমার মায়ের মুখের ভাষা। ভালো না বেসে পারি বলো।
ঠিকই বলেছিস মা। আমি ধন্য।
ববি ববি মা ডাকে।
পৃথু পৃথু বাবাও ডাকে।
আমি অসহায় হয়ে প্রশ্ন করি, বাবা, মা কাকে ডাকছো?
দুজনে উত্তর দেয়, তোকে।
কি প্রয়োজন ছিল দুটো নাম রাখার। একনামে ডাকতে পারো না।
দুটো নামই মিষ্টি। ডাকলে রাগ হয় কেন? মা প্রশ্ন করে।
ববির চেয়ে পৃথু নামটির ওজন অনেক বেশি। আমার মনে হয়, দুজনে পৃথু নামে মেয়েকে ডাকি। কি বলো শাশ্বতী। বাবা মাকে লক্ষ করে বলে।
কী কঠিন নামÑ পৃথু! ববি! কী মিষ্টি নাম। আদর ঝরে পড়ে। এই নামেই ডাকো মেয়েকে। মাও উত্তর দিতে ছাড়ে না।
এভাবে মা-বাবার ঝগড়া হয়। ছোট-ছোট, বড়সড় নয়।
আমার ভালো লাগে এটা। দুজনের ভালোবাসায় ভেজাল নেই।
আজ ভার্সিটিতে তিনটা ক্লাস। ক্লাস শেষে রীনুর সাথে কথা বলছিলাম। রীনু একটি ছেলেকে পছন্দ করে। ব্যাংকার। নাম আসিফ। মা-বাবার একমাত্র ছেলে। রীনু বলে, জানিস পৃথু, আসিফ এ বছরই বিয়ে করতে চায়। কি বলবো জানি না। মা-বাবা জানে না আসিফের কথা। বলতে ভয় হয়। যদি রাজি না হয়!
সেকি কথা। মা-বাবাকে বলবি না? ওদের বল।
ওরা এসব পছন্দ করে না। ওদের পরিচিত ছেলে দেখে বিয়ে দেবে। কিন্তু আমি আসিফকে ভালোবাসি। ওকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারি না আমি।
এটা তো একবিংশ শতাব্দী। পোস্টমডার্ন যুগ। এ যুগে ওই পুরনো ভাবনা সাজে? আমি বলি।
তাহলে উপায়? কি করবো বল!
তখনই ববি ববি বলে কাছে আসে প্রিয়াংশু। রীনু চারিদিক দেখে, অন্য কেউ আছে কি? না তো, পাশে কেউ নেই। তবে ববিটা কে?
পৃথু ঠোঁট কামড়ে হাসে। একদিন কথা প্রসঙ্গে প্রিয়াংশুকে বলেছিলাম, মা ববি নামে ডাকে, বাবা পৃথু নামে।
রীনু প্রশ্ন করে, প্রিয়াংশু, ববিটা কে? এখানে আমি, পৃথুলা ছাড়া কেউ নেই।
ঐতো, পৃথুলাই ববি। ভারি মিষ্টি নাম বলো।
মিষ্টি তো, তবে এই নামে ডাকছ। তুমি দিয়েছ?
না রীনু, ওর মা ঐ নামে ডাকে। মিষ্টি তো! আমিও ডাকি। আমি ববিকে ভালোবাসি তাই।
আমি লজ্জায় চোখ ঢাকি। এটা কি বলছে প্রিয়াংশু। আমাকে ভালোবাসে। কোনোদিনও আমাকে জানায়নি সে।
ও হ্যাঁ, এবার একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটিতে বেড়াতে যাবো ববি। পতেঙ্গা বিচে। রীনু তুমিও যাবে সাথে।
না না ভাই, আমি যাবো না। সেদিন আমাদের বাসায় অনুষ্ঠান।
কিসের? আমি প্রশ্ন করি।
আমার ছোটভাই লিওনের জন্মদিন।
ঐদিন ঐটুকুই। রীনু চলে যায়। পৃথু বলে, প্রিয়াংশু তুমি আমাকে ভালোবাসো? ছি ছি আমি জানি না। আমিও কিন্তু প্রিয়াংশুকে পছন্দ করি। মনে-মনে ভালো লাগে। সাহস করে বলিনি।
সেকি আমি বুঝি না! দুষ্টু মেয়ে। প্রিয়ংশু হাসি মুখে বলে।
আমি কি বলেছি তোমাকে আমার ভালো লাগে?
বলতে হয় না। বুঝি। এখন বলো তাহলে!
না, আমি বলতে পারবো না।
তখনই প্রিয়াংশু আমার বামহাত ধরে বলে, তুমি সত্যি কথাটা বলবে।
হ্যাঁ কি না। না হলে চলে যাবো। আর কোনোদিনই তোমার মুখোমুখি হবো না। আমি এই প্রথম একটি মেয়েকে মনের মতো পেয়েছি। যাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি আমি।
আমার লাজুক চোখজোড়া লাল হয়ে যায় নিমিষে। হতভম্ব আমি। শরীরটা কাঁপতে শুরু করে। হাতটা ছাড়িয়ে নিই। প্রিয়াংশুর চোখে চোখ রাখতে পারি না লজ্জায়। প্রিয়াংশু আবারও বলে, ববি বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো?
আমি না করতে পারি না। কি বিশ্বাসে, কার ওপর আশ্বস্ত হয়ে বিনা দ্বিধায় বললাম, ঠিক আছে, তবে তাই হোক, ভালোবাসি!
প্রিয়াংশু লাফাতে শুরু করে আমার মুখের কথায়। অন্য ছাত্ররা প্রিয়াংশুর কাণ্ড দেখে আর আড়চোখে হাসে।
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। সকালে পাশের বন্ধুদের সাথে শহীদ মিনারে যাই ফুল দিতে। ওমা সেকি ব্যাপার! শহীদ মিনারের একপাশে বন্ধুদের সাথে প্রিয়াংশু দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে ছুটে আসে। ও বলে, তুমি আসবে বলোনি তো!
প্রতি বছর আসি। বাবার আদেশ। বাবা একুশে ফেব্রুয়ারিকে বড্ডো ভালোবাসে। এই একুশে ফেব্রুয়ারি নাকি বাঙালিদের অস্তিত্ব, গর্ব, অহংকার। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের ফসল বাংলাভাষা এবং আজকের এই বাংলাদেশ।
ঠিকই বলেছ ববি। আমি অতটা গভীরভাবে ভাবিনি কোনোদিন। আরো কিছুক্ষণ থাকবে নাকি চলে যাবে?
প্রচণ্ড খিদেয় পেট জ্বলছে। বললাম, চলো কিছু খাই। খিদে পেয়েছে।
প্রিয়াংশু বলে, চলো। আমারও খিদে পেয়েছে।
পাশাপাশি হাঁটছি। প্রিয়াংশু বারবার আমাকে দেখছে। আমি জানি ও কিছু বলতে চায়। হয়তো আমার শাদা রঙে লালপাড়ের শাড়ি, লাল টিপ, লালচুড়ির কথা বলবে।
প্রিয়াংশু বলে অন্যকথা, ববি তোমাকে যত দেখি তার চেয়ে বেশি
অবাক হই, তোমার ব্যক্তিত্ব দেখে। তুমি অসাধারণ, অনন্য।
সেটা কি রকম। আমার প্রশ্ন।
তুমি অন্য মেয়েদের মতো নও। তোমার হৃদয়ে একুশের চেতনা। প্রিয় বাংলাদেশের প্রতি অগাধ প্রেম, শ্রদ্ধা। তাছাড়া তোমার কাপড় পরার বিচক্ষণতা। এই যে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদের লাল রক্ত। সেটা বিবেচনায় লালপাড়ের শাদা শাড়ি, লাল টিপ, লালচুড়ি, ভাবা যায় বলো? প্রিয়াংশুর একগাদা উত্তর।
সে আবারও বলে, ববি তোমার মনে আছে? বিকেলে পতেঙ্গা বিচে যাবো!
হ্যাঁ, মনে আছে। তবে তোমার সাথে দেখা কোথায় হবে?
তোমার বাসার সামনে অপেক্ষায় থাকবো ঠিক তিনটায়। তুমি দেরি করো না, আসবে। ঠিক আছে, তাই হবে।