পান্থজন জাহাঙ্গীর »
সেদিন সকালে ঘুম ভেঙেই বুঝলাম, কিছু একটা বদলে গেছে। টিনের ছাদে কোনো শব্দ নেই। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা নেই। উঠোনের কাদামাটি শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, বর্ষা চুপিচুপি চলে গেছে। আমি দৌড়ে পুকুরপাড়ে গেলাম। যে পুকুরে কয়েক দিন আগেও ব্যাঙেরা সারারাত ডাকত, আজ সেখানে শুধু হালকা বাতাস। কদমগাছেও আর নতুন ফুল নেই। আমি একটু মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছিলাম। ঠিক তখনই দেখি, আমার বন্ধু শুভ, রুবেল, মুনিয়া আর রিফাত মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আছে।
শুভ বলল,
‘চল।’
‘কোথায়?’
‘আজ শেষ নৌকা ভাসাব।’
আমি অবাক হয়ে বললাম,
‘এখন? পানি তো কমে গেছে!’
রুবেল হেসে বলল,
‘তাই তো। বর্ষাকে বিদায় না দিলে সে আবার আসবে কী করে?’
আমরা সবাই পুরোনো খাতার পাতা বের করলাম। একজন একটা নৌকা বানাল। আরেকজন দুটো। আমি একটা নৌকার ভেতরে ছোট্ট করে লিখলাম
‘আবার এসো।’
মুনিয়া তার নৌকায় একটা কদমফুলের পাপড়ি রাখল। রিফাত রাখল একটা শালিকের পালক। শুভ শুধু একটা ছোট্ট হাসির মুখ আঁকল। আমরা গ্রামের শেষ জলভরা সরু নালার ধারে দাঁড়ালাম। একসঙ্গে পাঁচটা নৌকা জলে নামিয়ে দিলাম। নৌকাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে চলল। কেউ কথা বলছিল না। শুধু নৌকাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ খুব হালকা একটা বাতাস এল। মনে হলো, নৌকাগুলো একটু দ্রুত এগিয়ে গেল। রুবেল ফিসফিস করে বলল,
‘দেখেছিস?’
‘কী?’
‘বর্ষা হয়তো এখনো পুরোপুরি যায়নি।’
আমরা কেউ হাসলাম না। কারণ তখন আমাদেরও ঠিক তাই মনে হচ্ছিল। নালাটা বাঁক নিতেই নৌকাগুলো চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমি অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। বাড়ি ফিরে দেখি, মা ভেজা জামাকাপড় গুছিয়ে রাখছেন। ছাতাটা রোদে শুকোতে দিয়েছেন। বাবা উঠোনের একপাশে কাদা লেগে থাকা কোদাল ধুচ্ছেন। দাদুর পুরোনো রেইনকোটটা আলমারির ওপর তুলে রাখা হচ্ছে। সবাই যেন বর্ষাকে বিদায় জানাচ্ছে। সন্ধ্যায় আকাশে অনেক তারা উঠল। আমি খাতাটা খুললাম। এই বর্ষায় আমি কত কিছু লিখেছি!
কাগজের নৌকা…
ঘুড়ি…
শালিক…
জোনাকি…
নদী…
দাদু…
বন্ধু…
আর কত বৃষ্টির শব্দ। শেষ পাতাটা এখনো খালি। আমি কলম তুলে লিখলামÑ
‘বর্ষা চলে গেছে।
কিন্তু তার গল্পগুলো রয়ে গেছে।
আগামী বছর প্রথম বৃষ্টি নামলেই,
এই খাতা আবার খুলব।’
খাতা বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকালাম। ঠিক তখনইÑ
টুপ!
একটা দেরি করে আসা বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কার্নিশে পড়ল। আমি মুচকি হেসে বললাম,
‘আমি জানতাম, তুমি বিদায় না বলে যেতে পারবে না।’
বর্ষা প্রতি বছর আসে। প্রতি বছর চলে যায়।
কিন্তু যে শিশুটি বৃষ্টির শব্দ শুনতে শেখে, কাগজের নৌকা ভাসায়, গাছের ছায়ায় দাঁড়ায়, পাখির বাসা দেখে চুপ করে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে একটি ছোট্ট ছাতা ভাগ করে নেয়Ñ
তার ভেতরে বর্ষা আর কখনো শেষ হয় না।





















































