মতামত সম্পাদকীয়

পাহাড় ধসের ট্র্যাজেডি : আর কত মৃত্যু

মাত্র গতকালই সুপ্রভাত বাংলাদেশে পাহাড় ধসের আশঙ্কা প্রকাশ করে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল। আর গতকালই কক্সবাজারে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে পাহাড় ধসে। গত ৬ ও ৭ জুলাই মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প, পেকুয়া ও সদরের দরিয়ানগরসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে ১১টি তাজা প্রাণ বিলীন হয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে নিষ্পাপ শিশু ও নারী।
প্রতি বছর বর্ষা এলেই পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু এ অঞ্চলে এক নির্মম ও নিয়মিত নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু কিংবা ২০১৭ সালের ১৩ জুন তিন পার্বত্য জেলাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১৫৮ জনের প্রাণহানির সেই ক্ষত মানুষ আজও ভুলে যায়নি। গত দুই দশকে এই অঞ্চলে পাহাড় ধসে প্রায় ৫০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু এত বিপুল প্রাণহানি ও বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পাহাড় ধস রোধে স্থায়ী কোনো সমাধান না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক।
পাহাড় ধসের এই মানবসৃষ্ট দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য সবার আগে প্রয়োজন পাহাড় কাটার মতো আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ করা। প্রভাবশালী চক্রের পাহাড় কাটা এবং একশ্রেণির লোভী মানুষের পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের প্রধান উপায় হলো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত মানুষদের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। কেবল বর্ষা এলে উচ্ছেদ অভিযান না চালিয়ে, বছরের অন্য সময়েও পাহাড় রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেসব পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেছে, সেখানে পরিবেশবান্ধব ও মাটি ধরে রাখতে সক্ষম—এমন গভীরমূলী গাছ রোপণ এবং গাইড ওয়াল নির্মাণ করা জরুরি।
পাহাড় ধস রোধে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দুর্যোগের মুহূর্তে মাইকিং করে বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে লোক সরিয়ে সাময়িক দায়িত্ব শেষ ভাবলে চলবে না। প্রশাসনকে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সুপারিশসমূহ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন—যে পাহাড়ই হোক না কেন, সেখানে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলতে যারা লিজ দিচ্ছে বা ঘর ভাড়া দিচ্ছে, সেইসব দখলদার ও পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে পাহাড় কাটা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে প্রতীয়মান হয়। পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের শুধু জরিমানা করার সনাতনী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং দ্রুত কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরই। পরিবেশ অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাহাড়ের বর্তমান অবস্থার নিয়মিত ম্যাপিং ও মনিটরিং করতে হবে এবং যেখানেই পাহাড় কাটার সামান্যতম উদ্যোগ দেখা যাবে, সেখানেই তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
সর্বোপরি, এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে ব্যাপক জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা যে মৃত্যুর কূপে বাস করার শামিল—এই চরম সত্যটি প্রান্তিক মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সাথে নিয়ে বছরজুড়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানবজাতি কখনো নিরাপদ থাকতে পারে না। প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ ও কঠোর অবস্থানই কেবল পারে বৃহত্তর চট্টগ্রামকে পাহাড় ধসের এই অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্ত করতে।

-advertise-