ওমর ফারুক »
কক্সবাজারের মহেশখালীর এক শান্ত জনপদ মাতারবাড়ী। এক দশক আগেও যেখানে ছিল শুধুই লবণের শুভ্রতা, চিংড়ি ঘেরের নিস্তব্ধতা আর পানের বরজের সবুজ ছায়া। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ যেখানে পাড় ছুঁয়ে ফিরে যেত, সেই উপকূলে আজ রচিত হচ্ছে এক নতুন মহাকাব্য। যে চরে একসময় শুধু জোয়ার-ভাটার খেলা চলত, সেখানে এখন আকাশছোঁয়া ক্রেন, বিশালকার ড্রেজার আর হাজারো শ্রমিকের কর্মযজ্ঞ। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর একটি দ্বীপ আজ রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাবে।
সুপ্রভাত বাংলাদেশের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে মাতারবাড়ী কেবল একটি ভৌগোলিক নাম নয়, এটি আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্রে মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতির এক উজ্জ্বল স্মারক। দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর, ১,২০০ মেগাওয়াটের আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) এবং এলএনজি টার্মিনালের সমন্বয়ে মাতারবাড়ী এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন ‘গেম চেঞ্জার’।
লজিস্টিকস ব্যবস্থার নিউক্লিয়াস ও বিগ-বি ধারণা
মেরিটাইম ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতারবাড়ী কেবল একটি নতুন সমুদ্রবন্দর নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার আমূল রূপান্তরের নিউক্লিয়াস। এই বন্দরকে কেন্দ্র করে সড়ক, রেল, জ্বালানি, শিল্প ও আঞ্চলিক সংযোগের যে বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠছে, তা দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। এই রূপান্তরের মূলে রয়েছে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় গৃহীত ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ ধারণা। জাপানের বিখ্যাত ‘কাশিমা বন্দর’-এর আদলে মাতারবাড়ীকে সাজানোর এই পরিকল্পনা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যে এক নতুন গতি সঞ্চার করবে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সড়ক, রেল ও যোগাযোগ অবকাঠামো ইতোমধ্যে আমূল বদলাতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের ফলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলীয় অঞ্চল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। এটি কেবল একটি বন্দর নয়, বরং একটি সমন্বিত শিল্প ও সরবরাহ চেইনের প্রাণকেন্দ্র।’
নির্মাণযজ্ঞের শুভ সূচনা ও কারিগরি সক্ষমতা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৬ সালের ৭ মে সাগরের বুকে বিশাল ড্রেজার চালনার মাধ্যমে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে জাপানের পেন্টা-ওশান কনস্ট্রাকশন ও তোওয়া করপোরেশন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২৪,৩৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের প্রথম ধাপ ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০৩০ সালে বন্দরটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৭০ একর এলাকাজুড়ে ১৮ মিটার গভীরতায় নৌ চ্যানেল ড্রেজিং করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে গড়ে ২,০০০ থেকে সর্বোচ্চ ২,৫০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার কন্টেইনার জাহাজ ভিড়তে পারে। কিন্তু মাতারবাড়ী বন্দর চালু হলে প্রথম পর্যায় থেকেই ৮,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার বিশালাকার ‘মাদার ভেসেল’ সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারবে। পরবর্তীতে এটি আরও বড় জাহাজ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করবে। এছাড়া প্রায় ৬,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি আধুনিক টার্মিনাল, যার অধীনে থাকবে ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি বহুমুখী (মাল্টিপারপাস) জেটি এবং ৪৬০ মিটার দীর্ঘ একটি কন্টেইনার জেটি।
বাণিজ্যিক প্রভাব : সাশ্রয় হবে সময় ও অর্থ
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটবে। বর্তমানে আমাদের ফিডার ভেসেলের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা পোর্ট কেলাং-এ পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, চীনসহ প্রধান উৎস দেশগুলো থেকে পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি মাতারবাড়ীতে আসলে যাতায়াত সময় অন্তত ৩ দিন কমে যাবে। সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে লজিস্টিকস ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচলকারী ৪টি জাহাজের সমান কন্টেইনার মাতারবাড়ীতে আসা মাত্র একটি মাদার ভেসেলে পরিবহন করা সম্ভব হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উদ্বোধনের আগেই সচল : এক অভিনব বাস্তবতা
মাতারবাড়ীর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, আনুষ্ঠানিক বন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশের বহু আগেই এর প্রধান অবকাঠামোটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালামাল ও কয়লা খালাসের সুবিধার্থে আগেভাগেই তৈরি করা হয়েছিল ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৫০ মিটার প্রশস্ত অ্যাপ্রোচ চ্যানেল এবং দেশের প্রথম ব্রেকওয়াটার (ঢেউ নিরোধক বাঁধ)।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা ‘ভেনাস ট্রায়াম্প’ প্রথম এই জেটিতে নোঙর করে। এরপর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মোট ২১৫টি জাহাজ মাতারবাড়ীর জেটিতে সফলভাবে পণ্য খালাস করেছে। এসব জাহাজে করে মোট ৬৬ লাখ ৫ হাজার ৫১৫ মেট্রিক টন কাঁচামাল ও কয়লা আনা হয়েছে। অর্থাৎ, বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে চালু হওয়ার আগেই মাতারবাড়ী কার্যত একটি কার্যকর মেরিটাইম হাবে রূপ নিয়েছে।
আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব ও কানেক্টিভিটি
মাতারবাড়ী কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাবে না; বরং এটি আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) জন্য এটি সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দর হবে। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সাথে মাতারবাড়ী থেকে সরাসরি ফিডার সার্ভিস চালু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। নেপাল ও ভুটান এই দুই ল্যান্ডলকড বা ভূ-বেষ্টিত দেশও মাতারবাড়ী ব্যবহার করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারবে। ট্রান্সশিপমেন্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎস খুঁজে পাবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফল করতে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনা হচ্ছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ২০২৩ সালে উদ্বোধন হওয়া দোহাজারী-কক্সবাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ পর্যটনের পাশাপাশি সমুদ্র বাণিজ্যের মূল শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। চকরিয়া থেকে মাতারবাড়ী বন্দর পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেললাইন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বন্দর থেকে কন্টেইনার সরাসরি ট্রেনযোগে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি ও দেশের যেকোনো শিল্পাঞ্চলে দ্রুত পৌঁছে যাবে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর থেকে ভারী কন্টেইনারবাহী লরির চাপ হ্রাস পাবে।
মিডা ও মহেশখালী আইল্যান্ড সিটি
মাতারবাড়ীর এই উন্নয়নকে একটি সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার গঠন করেছে ‘মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (মিডা)। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা মিডার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, মহেশখালীকে একটি আধুনিক সমুদ্রবন্দরনির্ভর ‘আইল্যান্ড সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। মিডার আওতায় প্রায় ৩৪,১৮১ একর জমিকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রাইমারি হাবে থাকবে বন্দর, লজিস্টিকস পার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি।
অন্যদিকে, রেসিডেন্সিয়াল হাবে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং সুপরিকল্পিত আবাসন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) প্রাক্তন পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাতারবাড়ি হবে সত্যিকারের গেম চেঞ্জার। মিডার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এটিকে হংকং টাইপের একটি ব্যবসায়িক হাব হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা রয়েছে। জাপানিজরা এটিকে নিজেদের মতো করে ডেভেলপ করতে আগ্রহী। এখানে এনার্জি, ট্রান্সপোর্ট ও কানেক্টিভিটি-তিনটিরই সুবর্ণ সম্ভাবনা আছে। ৬ লেনের রাস্তা এবং মেরিন ড্রাইভ কানেক্টিভিটি হলে এখানে বিশাল শিল্পায়ন হবে। কেবল বন্দর নয়, এটি হবে একটি সম্পূর্ণ কমার্শিয়াল সিটি।’
বিনিয়োগের নতুন জোয়ার ও কর্মসংস্থান
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে সরকারি অবকাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও জোয়ার এসেছে। ৫১,৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৮,৩৪১ কোটি টাকার এসপিএম প্রকল্প এবং এলএনজি টার্মিনালগুলো ইতোমধ্যে মাতারবাড়ীকে একটি জ্বালানি হাবে পরিণত করেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী টি কে গ্রুপ আগামী ১৫ বছরে ধলঘাটায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে তেল শোধনাগার এবং পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে।
মিডার প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে সরাসরি প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ২০৩০ সালে যখন বিশালাকার মাদার ভেসেল প্রথম সাইরেন বাজিয়ে মাতারবাড়ী চ্যানেলে নোঙর করবে, সেদিন কেবল একটি বন্দরের যাত্রা শুরু হবে না; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশ।
ফেনীর সোনাগাজী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, পতেঙ্গা, আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজারের মহেশখালী পর্যন্ত যে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প করিডোর গড়ে উঠছে, মাতারবাড়ী হবে তার হৃদপিণ্ড। সুপ্রভাত বাংলাদেশের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে মাতারবাড়ী আমাদের স্বপ্ন ও সামর্থ্যের এক অপরাজেয় প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটিই সেই গেম চেঞ্জার, যা আগামীর স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ দেখাবে।

















































