মতামত সম্পাদকীয়

নির্মম মানবিক ট্র্যাজেডি

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৮ জন শিক্ষার্থীর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়, এটি একটি চরম মানবিক সংকটের নির্মম বহিঃপ্রকাশ। নিজ দেশ মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই নিষ্পাপ শিশুরা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এক টুকরো নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পায়নি। পাহাড় ধসের এই নির্মম ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। নিহত খুদে শিক্ষার্থীদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা। এই ক্ষতি অপূরণীয়, এবং এই ট্র্যাজেডি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, শরণার্থী শিবিরের লাখ লাখ মানুষ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও অমানবিক পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সেখানে পাহাড় ধস ও বন্যার ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করে। পাহাড় কেটে অস্থায়ী আশ্রয়ণ শিবির তৈরি করায় মাটির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে ধসের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর—বিশেষ করে শিশু ও শিক্ষার্থীদের—নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি, ক্যাম্পের অবকাঠামোকে টেকসই করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা আবশ্যক। এই শিশুদের জীবনের সুরক্ষা না দিতে পারলে তা হবে মানবতার জন্য এক বড় ব্যর্থতা।
উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের বর্তমান দুর্গতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একদিকে গাদাগাদি করে থাকা, বিশুদ্ধ পানির অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অন্যদিকে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই। এর ওপর যোগ হয়েছে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আতঙ্ক। আন্তর্জাতিক সাহায্য দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসায় খাদ্য ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে অবস্থান স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সুরক্ষার ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের সসম্মানে ও নিরাপদে তাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়ে যে উদারতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে অনন্তকাল ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা বহন করা অসম্ভব। বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে, যাতে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে সমালোচনার যোগ্য। তারা প্রতিনিয়ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কার্যকর কোনো চাপ মিয়ানমার সরকারের ওপর সৃষ্টি করতে পারেনি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আহ্বান—কেবল আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বা মৌখিক সহানুভূতি প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। যতক্ষণ না প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মানবিক ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক তহবিল সচল রাখতে হবে। উখিয়ার ৮ শিক্ষার্থীর এই করুণ মৃত্যু যেন বিশ্ব বিবেকের চোখ খুলে দেয় এবং একটি স্থায়ী সমাধানের পথ প্রশস্ত করে।

-advertise-