ফিচার শিল্প-সাহিত্য

নজরুলের ভাঙনের আড়ালে সৃষ্টি

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত »

অগ্নিবীণা (১৯২২) কাব্য নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যখন আবির্ভূত হন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে তখনÑইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন তুঙ্গে। দেশমাতার অপমান ও লাঞ্চনার তিক্ত স্মৃতি এবং বঞ্চিত-লাঞ্চিত মানুষের করুণ কাহিনী তাঁকে করেছে বিদ্রোহী। এ-বিদ্রোহ অত্যাচার অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে। নজরুল কাব্যের সর্বত্রই তাই বন্ধন ও অধীনতাকে অস্বীকার করার বাসনা ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে অবাধ স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষা। জীবন ও জগতের সর্ব ক্ষেত্রেই তিনি ‘পদ্ধতির শিকল’ ভাঙতে চেয়েছেন। সামাজিক শোষণের সূত্র ভেঙে নতুন বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টির সংগ্রাম করেছেন।
প্রথম জীবনে নজরুল নার্গিসকে ভালোবাসেন এবং বিয়ে করেন (১৭ জুন, ১৯২১), কিন্তু তাঁদের মিলন ঘটেনি স্বার্থান্ধ সমাজের কারণে। তাই অগ্নিবীণায় নজরুল এ জীর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে ভাঙনের গান গেয়েছেন। এ ভাঙন ধ্বংস নয়, নতুন করে সৃষ্টির জন্য ভাঙন, যা নিপীড়িত জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে। নজরুলের অগ্নিবীণায় যে ভাঙনের গান শোনা যায় তার ভাষা যুগিয়েছে তাঁর দেশাত্মবোধ এবং মানবপ্রেম। এ জন্যেই তাঁর কাব্যে-গানে যত ভাঙনের গান, তার আড়ালে সৃষ্টির আকাক্সক্ষাই মুখ্য। ‘প্রলয়োল্লাস’ অগ্নিবীণার প্রথম কবিতা। এর প্রথম স্তবকেই কবি বলে ওঠেন-
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নতুনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়।’ (প্রলয়োল্লাস)
রুশ বিপ্লবের বিজয় (১৯১৭) তথা বিশ্বজুড়ে যে বিপ্লব এসেছে কবির বিশ্বাসে তা জীবন্মৃত পৃথিবীকে পূণর্জীবিত করতে পারবে। ডিসেম্বর ১৯২১-এ কুমিল্লা থেকে কলকাতায় ফিরে নজরুল তাঁর দুটো ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সৃষ্টিকর্ম বাঙালিকে উপহার দেন। একটি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, আর অন্যটি ‘ভাঙার গান’ সঙ্গীত। এই দুটো রচনা বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল ভারতবর্ষের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এসময়ে নজরুল আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’ রচনা করেন, যার মাধ্যমে তাঁর সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা এবং ভারতবর্ষের মুসলমানদের খিলাফৎ আন্দোলনের অসারতার পরিচয় স্পষ্ট। নজরুল তাঁর রাষ্ট্রীয় ধ্যান-ধারণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন আতাতুর্ক মোস্তফা কামাল পাশার (১৮৬১Ñ১৯৩৮) নেতৃত্বে যখন সামন্ততান্ত্রিক খিলাফৎ বা তুরস্কের সুলতানকে উচ্ছেদ করে তুরস্ককে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়। তুরস্কের সমাজ-জীবন থেকে কামাল যে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করেন, তা নজরুলকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি মনে করতেন যে, তুরস্কে যা সম্ভব, এখানেও তা অসম্ভব নয়। বস্তুত, গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও আচারসর্বস্বতা থেকে দেশবাসীর মুক্তির জন্য নজরুল আজীবন সংগ্রাম করেন। বিপ্লব ঝড়ের মতো, বন্যার মতো। ঝড় ও বন্যার পরে যেমন প্রকৃতিতে নতুন প্রাণ জাগে; প্রাণহীন মলিন অসুন্দরকে ধ্বংস করে নতুন জীবন গড়ে তোলাতেই বিপ্লবের গৌরব। তাই তো কবি বলেন-‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নতুন সৃজন বেদন; / আসছে নবীন জীবন হারা অসুন্দরের করতে ছেদন।’ (প্রলয়োল্লাস)। কারণ বিদ্রোহী কবি, সৈনিক কবি, কাজী নজরুল ইসলাম জানতেন যে, ‘ভেঙ্গে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর’ মূলত কবি অগ্নিবীণায় সেই সুন্দরের সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। যা সৃষ্টি করে, উদ্ভাবন করে উন্মোচন করে, এক চির সুন্দর অভিনতুন জগৎ-সংসার। সুখ যেখানে স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবিকে একনজরে ভাঙনের কবি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সৃজন যে প্রলয়ের সংগমিত পূর্ণসৃষ্টি এবং তা পূর্বাবধি প্রকাশিত। একদিকে তিনি বলেন-
‘মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ আমি সাইক্লোন আমি ধ্বংস’
কিংবা,
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’
এ দৃষ্টি থেকেই কবির কবিতায় ভাঙন-গড়নের সমন্বয় ফুটে উঠেছে। কবির যুদ্ধ মোটেই জঙ্গী মতাদর্শের নয় বরং মানবতার-মুক্তির-শান্তির সর্বোপরি সৃষ্টির বারতার:
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
নজরুল মারমুখো হয়ে বিদ্রোহ করলেন প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র-কাঠামোর বিরুদ্ধে। নতুনভাবে গড়তে চাইলেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে। কিন্তু বাহুবল তাঁর ছিল না। অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি তুলে ধরলেন অগ্নিবীণার বজ্রসিক্ত বর্শা; এটমের মতো তা নিক্ষিপ্ত হতে লাগলো সমাজ ও রাষ্ট্রের দেহে। আর পরিশেষে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করলেন-
‘আমি সেইদিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশ বাতাস ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’
বিদ্রোহী কবিতায় ভাবের যে বিচ্ছুরণ ঘটেছে তার মূল্য সাহিত্যে অপরিসীম। বিদ্রোহী কবিতার সঙ্গে অগ্নিবীণার আর সব কবিতাগুলোও একই সূত্রে গাঁথা। সকল ধর্মের ঐতিহ্যই বিদ্রোহী চেতনায় নির্জীব গমনকে উদ্বেলিত করে। এ এক সুনিশ্চিত শিল্পমাত্রা; তাই তাঁর কাব্যে ধর্মীয় চেতনা এসেছে শক্তির প্রকাশ হিসেবে। বিদ্রোহের অগ্নিবীণায় নীলাভ রশ্মিতে শান্তির বীণা হয়ে। তাঁর বিশ্বাস চণ্ডীরূপী বিপ্লব ধ্বংসের বুকে নতুন সৃষ্টি জাগাতে পারে; তাইতো তার লেখনীতে প্রকাশ-‘ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর / সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।’ (রক্তাম্বরধারিণী মা)। আবার, ‘ধূমকেতু’ কবিতায় কবি স্রষ্টার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সৃষ্টির জয় ঘোষণা করেছেন- ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু।/ এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।’ দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে উত্তরণের গান ‘খেয়াপারের তরণী’ এ কবিতা দিয়ে কবি সমগ্র বিশ্বের মোহনিদ্রা ভাঙাতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর ‘কোরবানী’ কবিতায় ‘হত্যা নয়’, ‘সত্যাগ্রহ’ এবং শক্তি কল্যাণ লাভের উপায়। শক্তি মাত্রেই হত্যা এবং ধ্বংসের মধ্য দিয়ে লাভ করে মুক্তি, লাভ করে কল্যাণ। তাঁর মতে হত্যা অথবা রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আসে সত্য, মুক্তি, কল্যাণ এবং স্বাধীনতা। ‘মোর্হরম্’ কবিতায় কারবালার হৃদয়বিদারক কাহিনী বিধৃত হয়েছে, কিন্তু কবিতাটি স্মৃতি-রোমন্থন বা অশ্রু বিসর্জন করেই শেষ হয়ে যায়নি। ঐ বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনীর স্মৃতি বর্তমানকে উদ্দীপ্ত করবার জন্য আরোপিত- ‘সকীনার শ্বেত বাস দেবো মাতা-কন্যায় / কাসিমের মত দেবো জান্ রুধি’ অন্যায়।’ স্বাধীনতা ও সত্য-ন্যায়ের জন্য প্রাণ উৎসর্গের প্রেরণা দান করবার মধ্যেই ‘মোর্হরম্’ কবিতার বৈপ্লবিক তাৎপর্য নিহিত।
নজরুল-রচনায় ধর্ম এসেছে নবজাগরণের স্লোগান হিসেবে। ধর্মবোধ-ধর্মচেতনা এসেছে বিদ্রোহের আধার হিসেবে। প্রচলিত নিয়ম, অন্যায়, অত্যাচার, জড়তা সবকিছুকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছেন কবি। তাইতো সাম্যবাদী কবি ইন্টারন্যাশনাল সংগীত রচনায়ও ধর্মের মর্মহীনতার মুখোশ ভাঙেন। যারা হিন্দুধর্মকে আচার সর্বস্ব করে এবং যারা ইসলামধর্মকে করে ফতোয়া সর্বস্ব তাদের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান, দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘আদি শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার / মূল সর্বনাশের এরে ভাঙিব এবার।’ (সাম্যবাদী গান)। সে সময়ে শুধু কী নজরুল এ-ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিলেন? না, সৈয়দ মুজতবা আলীও ছিলেন; তিনি বলেন, ‘সমাজে ব্যক্তির সুষ্ঠু জীবন যাপনের সুবিধার্থেই ধর্মের প্রয়োজন। অন্যথায় ফতোয়ার সমষ্টি মাত্র যে কেতাব দরদহীন নীতিসর্বস্ব সেটা কুমড়ো-কাটা করলে মানবকুলের কোনো ক্ষতি হবে না এ নিশ্চিত’। নজরুলও বিশ্বাস করতেনÑ‘ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধর্ম’। এ-উপলব্ধির সঙ্গে তিনি যখন দেখেন ধর্মের ধ্বজাধারীদের সৃষ্ট বাধা-নিষেধের ডোরে বাঁধা সমাজে মানুষের বিকাশের পথ অনেকাংশে রুদ্ধ তখন তিনি গর্জে ওঠেন
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, নিয়ম কানুন শৃঙ্খল! (বিদ্রেহী)
শৈশবে-কৈশোরে নজরুল মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, ধর্ম-ব্যবসায়ীদের লীলাখেলা তখনই তিনি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান; দেখেন ভজনালয়ে দলাদলি, স্বার্থের হানাহানি। এ দেখে তিনি বলে উঠেন ‘তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী। / মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি’ (মানুষ)। শতবছর আগে সাম্যবাদী (১৯২৫) কাব্যেও লাঞ্ছিত নিস্পেষিতদের কী করুণ আর্তনাদ তাঁর সৃষ্টিকর্মে ধরা পড়ে! হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ, জাতিভেদ প্রথা, ধর্মের নামে মারামারি-হানাহানি তিনি আদৌ বরদাস্ত করেননি; বরং এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কীভাবে মিলন ঘটানো যায় তাই ছিল তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন। চণ্ডীদাস গেয়েছিলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই,/ সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই।’ এ যুগের চণ্ডীদাস রূপে নজরুল কণ্ঠেও তা প্রতিধ্বনিত হয়Ñ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’। এসব শোনে গোস্সায় মোল্লারা কামড়ে ধরেন নিজেদের গোশ্তÑ‘ব্যাটা বলে কী’? বোঝার ভুলে রাগ বাড়ে ‘আল্লাহকে আরশচ্যুত করে বসায়েছে মানুষকে। শিরক নির্ঘাত। কাফের নিশ্চয়।’ নজরুলও কম যান না, ‘প্রলয়-শিখা’ কাব্যগ্রন্থে বিংশ শতাব্দীর বাঙালি-বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছেন এভাবে
‘কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম-নেশা,
ধ্বংস করেছি ধর্ম যাজকী পেশা।
ভাঙ্গি মন্দির, ভাঙ্গি মসজিদ
ভাঙ্গিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত
এক মানবের একই রক্ত মেশা
কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা।’ (বিংশ শতাব্দী)
শৈশবে আসানশোলে রুটির দোকানে চাকরি জীবনে ময়দা মাখতে মাখতে হয়তো তাঁর মনে উদয় হয়, দুনিয়াটাকে দলেমলে মনের মতো করে গড়বেন। যত অনাচার, যত অন্ধ শাস্ত্রাচার সবারই মূল উৎপাটন করবেন। সর্বহারার গান গেয়ে সর্বজয়ী হবেন। এ ভাবনা শৈশব থেকে তাঁর মনে ঠাঁই নিয়েছিল, তাই তিনি পুরাতনকে বরদাশত করতে পারেননি। তাই সৃষ্টির নেশায় মেতে ছিলেন তিনি, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে / মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে।/ মোর টগ্বগিয়ে খুন হাসে’। দোলন-চাঁপা (১৯২৩) কাব্যগ্রন্থের প্রেমের গান আর নরম সুরের কবিতায়ও সৃষ্টির আনন্দে তাঁর রক্ত টগবগ করে। তার পরের বছরে অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ডের নাম বিষের বাঁশী (১৯২৪) নামকরণের কৈফিয়ৎ দিয়ে কবি লেখেন, বাঁশী হচ্ছে সুরের, আর বাঁশ হচ্ছে অসুরের’। এই নজরুলবর্ষে বাঙালি বাঁশের বিচিত্র ব্যবহারে বিভ্রান্ত বলা যায়। তাই বর্তমান বিশে^র বাঁশের কেলানি থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুলের সৃষ্টিসুখের বাঁশি বাজিয়ে বাঙালির বিপদ-মুক্তির আকাক্সক্ষা আয়ত্তে আসতেও পারে বৈকি।

---------