এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
গ্রামের পশ্চিমপাড়ায় একটা ছোট্ট মোড়। নাম তার কানাগলির মোড়। রাস্তা এসে সেখানে শেষ হয়েছে, কিন্তু আড্ডার কোনো শেষ নেই। মোড়ের প্রাণকেন্দ্র মানু মোল্লার চায়ের দোকান। বাঁশের বেঞ্চ, টিনের চাল, কেটলির ধোঁয়া আর চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ- সব মিলিয়ে যেন গ্রামের ক্ষুদে সংসদ।
বিকেল চারটা বাজলেই হাজির হয় সাত রত্ন- চান্দু মিয়া, হারু মিয়া, ঝরু ফকির, মফিজ সরদার, কানু শেখ, রুস্তম আলী আর টাক্কু কাশেম। গ্রামের মানুষ ওদের ডাকে-“সাত সমালোচক”। কারণ নিজেদের কোনো কাজ না থাকলেও অন্যের কাজের সমালোচনায় এদের জুড়ি নেই।
চান্দু মিয়া নিজেকে এলাকার ভবিষ্যৎ নেতা ভাবে। হারু মিয়া দাবি করে, জেলা শহরে তার নাকি অনেক বড়ো বড়ো পরিচয়। অথচ শহরে গেলেই বাসস্ট্যান্ড থেকে পথ ভুলে যায়।
ঝরু ফকিরের বিশেষত্ব গুজব ছড়ানো। সে গর্ব করে বলে, “যে খবর আমি জানি, সেটা টেলিভিশনও পরে জানে!”
মফিজ সরদার এমনভাবে হাঁটে, যেন চেয়ারম্যানও তার অনুমতি নিয়ে চলাফেরা করেন।
কানু শেখ বছরে তিনবার রাজনৈতিক মত বদলায়। যে দল ক্ষমতায়, সে দলই তার কাছে আদর্শ।
রুস্তম আলী আয়নায় নিজেকে দেখে বেশি, মানুষের দিকে কম।
আর টাক্কু কাশেমের মাথায় চুল নেই, কিন্তু পকেটে সবসময় একটা চিরুনি থাকে।
একদিন হারু মিয়া জিজ্ঞেস করল, কাশেম ভাই, চিরুনি রাখেন কেন?
কাশেম গম্ভীর মুখে বলল, চুল নাই তো কী হইছে? সম্মান তো আছে!
মুহূর্তেই হো হো করে হেসে উঠল সবাই।
এদিকে মানু মোল্লা হিসাবের খাতা খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-চান্দু, নয় মাসের চায়ের বিল কবে দিবি?
চান্দু নির্বিকার মুখে বলল, -দেশের অর্থনীতি ঠিক হলেই।
মানু মোল্লা মাথা নেড়ে বললেন, -তাহলে মনে হয় আমার টাকা আর পরকালেই পাব!
হাসির রোল পড়ে গেল দোকান জুড়ে।
মোড় দিয়ে কেউ নতুন জামা পরে গেলে মন্তব্য-“শ্বশুরবাড়ির টাকা!”
কেউ মোটরসাইকেল কিনলে- “ব্যাংকের লোকজন ঘুমিয়ে ছিল!”
কেউ চাকরি পেলে-“ভাগ্য ভালো ছিল, মেধা না!”
একদিন কলেজপড়ুয়া সজীব বই হাতে যাচ্ছিল। ঝরু ফকির বলল, -এই ছেলেটা সারাক্ষণ বই পড়ে। জীবনটাই নষ্ট!
ঠিক তখনই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজিজ মাস্টার এসে বললেন, -বই পড়ে জীবন নষ্ট হয় না, অলস আড্ডায় বসে জীবন নষ্ট হয়।
মোড়ে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এল। তারপর টাক্কু কাশেম ফিসফিস করে বলল, – মাস্টার মানুষ, কথা কইতেই পারে!
রাত নামলেই শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। রুস্তম আলী মোটরসাইকেলের এমন শব্দ তোলে যে গ্রামের মুরগিরাও নাকি ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেয়- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
একদিন এক বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলেই ফেললেন, – বাবা, মোটরসাইকেল চালাও, যুদ্ধ ঘোষণা কইরো না!
চারদিকে আবার হাসির ঢেউ।
এদিকে স্কুল-কলেজের মেয়েরা ওই পথ দিয়ে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিল। আড্ডাবাজদের ফিসফাস, সিটি আর ফালতু মন্তব্যে সবাই অতিষ্ঠ।
একদিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাশেম মেম্বার এসে বললেন, -এই চান্দু, সারাদিন এখানে বসে থাকিস কেন?
চান্দু বুক ফুলিয়ে বলল, -আমরা সমাজ পর্যবেক্ষণ করি।
মেম্বার মুচকি হেসে বললেন, -সমাজ পর্যবেক্ষণ না, সমাজের ধৈর্যের পরীক্ষা নিস!
মানু মোল্লা এত জোরে হেসে উঠলেন যে কেটলির ঢাকনাই মাটিতে পড়ে গেল।
কয়েকদিন পর গ্রামের কয়েকজন তরুণ মিলে মোড়ে একটি ছোট্ট পাঠাগার গড়ে তুলল। সন্ধ্যায় শিশুদের পড়ানো, দাবা খেলা আর সপ্তাহে একদিন পরিচ্ছন্ন অভিযান শুরু হলো।
চান্দুদের দল ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, -বই পড়ে পেট ভরে?
রুবেল হেসে উত্তর দিলো না, মাথা ভরে।
মানু মোল্লা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন, -আর তোদের মাথাটা বহুদিন ধরেই খালি পড়ে আছে!
দোকানজুড়ে আবারও হাসির ঝড় উঠল।
কিন্তু এক মাস পর দৃশ্য বদলে গেল।
হারু মিয়া ফুলের টবে পানি দেয়। ঝরু ফকির লুকিয়ে গল্পের বই নিয়ে যায়। মফিজ সরদার নিয়মিত দাবা খেলতে বসে। রুস্তম আলী মোটরসাইকেলে সাইলেন্সার লাগিয়ে চালায়। টাক্কু কাশেম নিজের চায়ের বিল নিজেই পরিশোধ করে।
মানু মোল্লা অবাক হয়ে বললেন, -আজ সূর্য পশ্চিমে উঠছে নাকি?
কাশেম হেসে উত্তর দিলো, না চাচা, শুধু বুদ্ধিটা একটু পূর্বদিকে ঘুরছে।
এখনও কানাগলির মোড়ে আড্ডা বসে, চায়ের কাপেও ধোঁয়া ওঠে। তবে সেই আড্ডায় আর কারও চরিত্রহনন হয় না, মেয়েদের উত্যক্ত করা হয় না, বিকট শব্দে গ্রামের শান্তিও ভাঙে না। মানু মোল্লা পুরোনো বাকি খাতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন, “একসময় এই মোড়ে চায়ের চেয়ে ফাঁকা বুলি বেশি বিক্রি হতো, এখন চায়ের সঙ্গে মানুষ একটু করে বিবেকও পান করে।” কানাগলির মোড় তাই আজ শুধু আড্ডার জায়গা নয়, বদলে যাওয়ার এক নীরব পাঠশালা।




















































