আসাদুজ্জামান খান মুকুল »
শনিবারের শেষ বিকেল, সারাদিন রোদের তাপ বেশ কড়া ছিল। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও ছিল না। অতসীর বাবা গিয়েছিলেন বৃক্ষমেলায়। সেখান থেকে ফিরে এসে বারান্দার চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। অতসী পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে-
“বাবা, তুমি খুব পরিশ্রান্ত, তাই না?”
বাবা চশমাটা নামিয়ে হেসে বললেন- “হ্যাঁ রে মা। কেন, কিছু বলবে?”
-”না বাবা। তুমি বসে আছ তাই।”
বাবা বললেন-”ও আচ্ছা আমার লক্ষ্মী সোনা! তবে দেখ তোমার জন্য একটা জিনিস নিয়ে এসেছি।”
অতসী উৎসাহ নিয়ে- “কই দেখি দেখি!”
বাবা পকেট থেকে বের করলেন মেলা থেকে আনা ছোট্ট একটা খয়েরি বীজ।
‘বাবা, এটা কিসের বীজ?’
বাবা স্নেহভরে অতসীর হাতের তালুতে বীজটা রেখে বললেন- ‘এটা এক রহস্যের ভান্ডার যত্ন করে আজ রেখে দাও, সময় পেলে বপন করবে, দেখবে একদিন সব বুঝতে পারবে।’
অতসী খুব যত্ন করে বীজটা হাতে নেয়। তার মনে হয় এরকম ছোট্ট বীজের ভেতর থেকেই তো একদিন বড় গাছ জন্মায়। সে মনে মনে ঠিক করে বীজটা নিজের হাতে বপন করবে।
সোমবার। ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম থেকে উঠে পড়ে অতসী। সকালের স্নিগ্ধ হাওয়ায় তার মন ভরে যায়। পুরোনো একটি লালচে মাটির টব জোগাড় করে উঠোনের একপাশ থেকে । কিছু ভেজা মাটি এনে তাতে ভরে। তাতে কিছু গোবর সার মিশিয়ে আলতো করে বীজটা মাটির নিচে গুঁজে দেয়। যেন ঘুমন্ত একটি শিশুকে শুইয়ে দিচ্ছে বিছানায়। তারপর অনেকক্ষণ টবটার দিকে চেয়ে থাকে। তার মনে হয় মাটির নিচের অন্ধকারে বীজটা একা আছে।
মঙ্গলবার। এদিকে অতসীর খুব তাড়া। পড়তে বসতে হবে, তাই তড়িঘড়ি করে মগটা নিয়ে বীজের ওপর ছিটিয়ে দেয় কয়েক ফোঁটা জল। তারপর জানালার ধারে রেখে স্কুলে যায়। ফিরে এসেই টবের কাছে এসে দেখে অঙ্কুর বের হয়েছে কিনা।
বুধবার। সকাল থেকে রোদের তেজ বেড়ে যায়। অতসী টবটা বারান্দার এমন এককোণে রাখে, যেখানে রোদটা তির্যকভাবে এসে পড়ে। উষ্ণতা পেয়ে মাটিও যেন প্রাণ ফিরে পায়।সে বারবার টবটার কাছে এসে দাঁড়ায়। কবে যে বীজের ঘুম ভাঙবে! অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চায় না। তার মনে হয় মাটির নিচে নিশ্চই জীবনের জন্মের প্রস্তুতি চলছে।
বৃহস্পতিবার। ভোরে আবার একটু জল ঢালে। জলের ফোঁটা মাটির ভেতর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে দেখে তার মনে হয় বীজটাও বুঝি তৃপ্তি ভরে জলপান করছে। তারপর বারান্দায় বসে চুপচাপ টবটার দিকে চেয়ে থাকে। মা হেসে জিজ্ঞেস করেন-
“কী রে- তুই টবের মাঝে কী পেয়েছিস?”
কিছুই না বলে অতসী শুধু মুচকি হাসে। বাবার বলা সেই রহস্যেটা নিজের চোখেই দেখতে চায়।
শুক্রবার সকালেও টবের চেহারায় কোন পরিবর্তন নেই। অতসীর মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। এমন সময় বাবা এসে পাশে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করে- “বাবা, এটা কি সত্যিই গজাবে? নাকি বীজটা নষ্ট হয়ে গেছে?”
বাবা স্নেহভরে মাথায় হাত রেখে বললেন-”মাটির নিচে কী ঘটছে তা তো বলতে পারব না। ধৈর্য ধরো লক্ষীটি সময় হলেই দেখতে পাবে।”
বাবার কথায় আতসীর মনে আশার আলো জ্বলে ওঠে।
রবিবার। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে ওদের ঘরে। বাইরে হালকা কুয়াশা । অতসী টবের কাছে যেতেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যায়। মাটির বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ছোট্ট একটি সবুজ চারা। মাথায় ফুটেছে দুটি কচি পাতা। যেন খিলখিল করে হাসছে।
অতসী আনন্দে চিৎকার করে ওঠে- “মা ও মা! বাবা বাবা! দেখো দেখো আমার বীজটা থেকে সত্যিই চারা গজিয়েছে!”
খুশিতে তার চোখ ঝলমল করে ওঠে। চারাটিকে ছুঁয়ে দেখার সাহস হয় না ,শুধু মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। ঠিক তখনই একফালি রোদ এসে পড়ে কচি পাতার ওপর। শিশিরভেজা পাতাগুলো মুক্তোর মতো ঝিকমিক করে ওঠে। সেই দৃশ্য দেখে আতসীর মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপহারটি যেন সেদিনের সকালে পেয়েছে।


















































