শৈল-সৈকত ও দেশগ্রাম

রাজপরিবার থেকে পূর্ণ মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, আনন্দে মাতোয়ারা বান্দরবান

জাহাঙ্গীর আলম কাজল, নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) >>

বান্দরবানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ ও বান্দরবান-৩০০ আসনের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় উচ্ছ্বাসে ভাসছে পুরো পার্বত্য জেলা। নতুন এই দায়িত্ব পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

---------

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বান্দরবান থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়াকে স্থানীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণকে ঘিরে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাচিং প্রু জেরী ঐতিহ্যবাহী বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত। তিনি সাবেক বোমাং রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরীর সন্তান এবং বোমাং রাজপরিবারের রাজপুত্র। রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সরকার পরিচালনার দক্ষতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় সাচিং প্রু জেরীর রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ১৯৮৬ সালে বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জয়লাভ করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। পরে ১৯৮৯ সালে বান্দরবান জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বান্দরবান আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাচিং প্রু জেরী। এর আগে ও পরে তিনি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, উন্নয়ন কার্যক্রম ও দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তাঁর রয়েছে দীর্ঘ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

বর্তমানে তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বান্দরবান-৩০০ আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং দীর্ঘ বিরতির পর আবারও জাতীয় সংসদে ফিরে আসেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় পাহাড়ি অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট নিরসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর এখন তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রসার, কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান, পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন হবে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজপরিবারের ঐতিহ্য থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসা সাচিং প্রু জেরীর এই নতুন অধ্যায়কে ঘিরে বান্দরবানের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশা ও উদ্দীপনা। এখন দেখার বিষয়, তাঁর নেতৃত্বে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়।