ফিচার শিল্প-সাহিত্য

ছোটগল্প এবং রবীন্দ্রনাথ

রতন কুমার তুরী »

আধুনিক মানব ˆচতন্যের সমুদ্র বিস্তৃত বিসঙ্গতি ও বিপর্যয়, অন্তরগূঢ় বেদনা ও উজ্জ্বল আশাবাদ এসব প্রবণতা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উনবিংশ শতাব্দীতে নতুন শিল্প আঙ্গিক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে ছোটগল্প| যার রূপকার রবীন্দ্রনাথ নিজেই| মূলত রেনেসাঁস উত্তরকালের উদ্ভূত পুঁজিবাদী সমাজের বহুমাত্রিক জটিলতা গল্পের বিষয় বিন্যাসে স্থান পেয়েছে, পেয়েছে চরিত্র সৃষ্টি ও প্রকৃতির নিবিড় মেলবন্ধন| রবীন্দ্র ছোটগল্প সাধারণ জীবনপ্রধান| মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, আবেগ, অভিমান আত্মবলিদান এবং মানব হৃদয়ের রহস্য উন্মোচন করেছেন নিঁখুতভাবে| তিনি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ গল্পের বিষয়বস্তুতে তুলে ধরেননি| আঁকেননি মধ্যবিত্ত জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মূল্যবোধের সংকটের ছবি| বরং তিনি প্রকৃতির একান্নবর্তী সংবেদনশীল চরিত্রসমূহের মনোময় অন্তর্জগৎকে উন্মোচনের পাশাপাশি বেদনা ও সংবেদনের রূপ দেখিয়েছেন|

রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গল্প সম্পর্কে বলেছেন ‘একটু একটু করে লিখছি এবং বাইরের প্রকৃতির সমস্ত ছায়া আলোক বর্ণ ধ্বনি আমার লেখার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে| আমি যেসব দৃশ্যলোক ও ঘটনা কল্পনা করছি, তারই চারদিকে এই রৌদ্র-বৃষ্টি, নদীরস্রোত এবং নদীতীরে শরবন, এই বর্ষার আকাশ, এই ছায়া বেষ্টিত গ্রাম, এই জলধারা প্রফুল্ল শস্যের ক্ষেত ঘিরে দাঁড়িয়ে তাদের সত্যে ও সৌন্দর্যে সজীব করে তুলছে|’

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির নিজ¯^ নগ্ন সৌন্দর্য ও অনির্বচনীয় মাধুর্য এমন সুক্ষভাবে তুলে ধরেছেন যে তিনি ছোট গল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃতি দেখেন |

রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের চরিত্রগুলো প্রকৃতিকে আবেষ্টন করে আছে| এখানে প্রকৃতিই প্রধান চরিত্র| ‘মিট মিট করিয়া প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং এক স্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ টপ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল|’ প্রকৃতির এই প্রতীকী উপস্থাপনা যেন রতনের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের চিত্র| আবার, পোস্টমাস্টার রতনকে ছেড়ে কলকাতায় যাবার পথে বর্ষার নদীতে বিশেষ পরিবর্তনের আল¤^ন বিভাবের চক্র লক্ষ্য করে ‘বর্ষা বিস্ফোরিত নদী ধরনীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মত চারিদিকে ছল ছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অন্তত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন| একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মকথা প্রকাশ করিতে লাগিল| — পালে তখন বাতাস পাইয়াছে বর্ষার স্রোত ও খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করে নদী কুলের শ্মশান দেখা যাইতেছে|’

‘জীবিত ও মৃত’ গল্পে কাদ¤ি^নী যখন শ্মশানে গিয়ে জীবন লাভ করল তখন ইতোমধ্যেই মানবজগতের সবাই তাকে পরিত্যাগ করেছে|

কিন্তু প্রকৃতির স্পর্শে সে প্রকৃতির ˆনকট্য আত্মীয়তা অনুভব করে যেমনটা রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরলেন, ‘যমালয়ে বুঝি এইরূপ চির নির্জন ও চিরান্ধকার| তাহার পর যখন মুক্ত দ্বারা দিয়া হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাদলার বাতাস এবং বর্ষার ভেকের ডাকের শব্দ কানে প্রবেশ করিল তখন এক মুহূর্তে তাহার এই ¯^ল্প জীবনের আশৈশব সমস্ত বর্ষার স্মৃতি ঘনীভূতভাবে তাহার মনে উদয় হইল এবং পৃথিবীর সংস্পর্শ সে অনুভব করিতে পারিল| একবার বিদ্যুৎ চমকিয়া উঠিল, সম্মুখে পুষ্করিনী, বটগাছ, বৃহৎ মাঠ এবং তরুশ্রেণী এক পলকে চোখে পড়ে|’ এটা বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথের প্রায় গল্পই বর্ষার সুরে বাঁধা| তিনি প্রকৃতির খেয়ালে গল্পের দোলাচল ঘঠিয়েছেন| গল্পে প্রকৃতিই যেন নায়ক|

প্রকৃতির সন্তান রবীন্দ্রনাথ তার জীবন ও বিচিত্র সাধনায় প্রকৃতিকে এক পৃথক স্থান দিয়েছেন| তার ছোটগল্পে বিষয় নির্বাচনেও তা পরিলক্ষিত| কোনো নিছক কিংবা ঠুনকো কিছু তার গল্পে ছিল না|

সুভা’ গল্পে এমনটাই দেখা যায়| সুভা যেন প্রকৃতির অব্যক্ত ভাষা, প্রকৃতি সুভার মধ্যে মানবী রূপ ধারণ করে মানুষের কাছে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে| তার বর্ণনায় ‘নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর – সব মিশিয়া চারিদিকের চলাফেরা আন্দোলন কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গ রাশির ন্যায় চিরনিস্তব্ধ হৃদয় উপকূলের নিকট আসিয়া পড়ে| প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি, ইহাও বোবায় ভাষা|’

সমাপ্তি’ গল্পে মৃন্ময়ী প্রকৃতির সহোদরা| রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি ও জীবনকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে দেখিয়েছেন | যেখানে মৃন্ময়ী উন্মুক্ত প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা হরিণ শাবকের মতোই বেগবান| অপূর্বর প্রেম অসফল, ব্যর্থ|

তাই সে প্রকৃতির স্পর্শেই যেন তার পূর্ণতা দিতে চাইছে ‘সেই প্রবল প্রেমেরই আগ্রহ কোন এক চাঁদের রাতে রূপকথার মায়ালোকে এনে উত্তীর্ণ করে দিয়েছে এবং তখন বাস্তবের হতাশা বেদনার কবল থেকে অন্তত সাময়িক মুক্তি অর্জন করে অপূর্ব মৃন্ময়ীতে সেই নিন্দ্রিতা রাজকন্যাকে আবিষ্কার করেছে একদিন সে তার প্রেমের স্পর্শে নিশ্চয়ই জাগবে|’

আনন্দের রসসিক্ত সরোবর প্রকৃতির অন্তরীক্ষে ভেসে যায়| রবীন্দ্র ছোটগল্পে প্রকৃতির আবহ এমনভাবে প্রস্ফূটিত মনে হয় তিনি প্রকৃতির আজন্ম লালিত সন্তান| ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে পাগলা মোহর আলীর চিৎকার ‘তফাৎ যাও’ সংযোগ অতিপ্রাকৃত হিসেবে ধরা দেয়|

প্রকৃতি রহস্যময়| রবীন্দ্রনাথ সে রহস্য উদঘাটনে সফল| তার গল্পগুচ্ছের প্রতিমুহুর্তে প্রকৃতির সেই অজ্ঞাত রূপ, শব্দ, গন্ধ অনির্দেশ্য মাধুরী মিশিয়ে তার রহস্য তুলে ধরেছেন|

প্রকৃতির অজানা অংশটুকু জানিয়ে দিয়েছেন| অসম্পূর্ণতাকে সম্পর্ণতা দান করেছেন| প্রকৃতি ও মানবের মাঝে বোধকরি তিনিই প্রথম সফলভাবে সখ্য গড়ে দিয়েছেন| রবীন্দ্রনাথ সত্যিই এক প্রকৃতিময় বিস্ময়কর নাম|