এ মুহূর্তের সংবাদ

সাফল্য ও আমাদের সম্ভাবনা

নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদন

আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শুঁটকি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে এবং প্রবাসী বাঙালিদের কাছে এর চাহিদার শেষ নেই। কিন্তু এই প্রিয় খাদ্যটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মনে কাজ করছে তীব্র আতঙ্ক। কাঁচা মাছ শুকানোর সময় মাছির উপদ্রব এবং লার্ভার আক্রমণ থেকে শুঁটকি বাঁচাতে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দেদারসে ব্যবহার করছেন ক্ষতিকর ও বিষাক্ত কীটনাশক। এই বিষাক্ত শুঁটকি খাওয়ার ফলে মানুষের ক্যানসার, লিভার, কিডনি ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এমন একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের পরমাণু বিজ্ঞানীদের পরিবেশবান্ধব ও যুগান্তকারী আবিষ্কার দেশের অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের এই সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো ‘বন্ধ্যা মাছি প্রযুক্তি’ বা স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক। শুঁটকির প্রধান শত্রু হিসেবে পরিচিত ‘রো ফ্লাই’ বা নীলচে সবুজ মাছি প্রতিরোধে গবেষকেরা এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত পুরুষ মাছিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক ‘কোবাল্ট-৬০’ যন্ত্রের গামা রশ্মির মাধ্যমে বন্ধ্যা করা হচ্ছে। এই বন্ধ্যা মাছিগুলো যখন প্রকৃতিতে উন্মুক্ত করা হয়, তখন স্ত্রী মাছির সাথে এদের মিলনের ফলেও কোনো ডিম বা বংশবৃদ্ধি হয় না। ফলে কীটনাশক ছাড়াই শুঁটকি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুকানো সম্ভব হচ্ছে। সোনাদিয়া দ্বীপে গত কয়েক বছরে প্রায় ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছেড়ে যে অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সফলতা পাওয়া গেছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের বিজ্ঞানীদের এক বিশাল গৌরবময় অর্জন।

এই প্রযুক্তির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কক্সবাজার উপকূলে প্রতিবছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হয়। কিন্তু গুণগত মান ও রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের শুঁটকি রপ্তানিতে বড় ধরনের বাধা ছিল। বিজ্ঞানীদের এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সঠিক ও দেশব্যাপী বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ঘটানো গেলে প্রতিবছর শতকোটি টাকার শুঁটকি ও খাদ্যশস্যের অপচয় রোধ করা সম্ভব। একই সাথে শতভাগ আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে শুঁটকি রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে, যা দেশের সামগ্রিক সুনীল অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
তবে এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে সরকারের নীতিগত সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দেশে বর্তমানে এই মূল্যবান যন্ত্র রয়েছে মাত্র দুটি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং এই সফল উদ্যোগকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হলে দেশের অন্যান্য প্রধান শুঁটকি উৎপাদন অঞ্চলেও ল্যাবরেটরি ও এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি, শুঁটকি উৎপাদনকারীদের এই বন্ধ্যা মাছি পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সনাতন বিষাক্ত পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা জরুরি।
পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীদের এই উদ্ভাবন প্রমাণ করে যে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের দেশের মেধা বৈশ্বিক সংকটেরও দেশীয় সমাধান বের করতে পারে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে সোনাদিয়া দ্বীপের এই সফল মডেল দ্রুত দেশের প্রতিটি শুঁটকি মহলে ছড়িয়ে দেওয়া হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।