চন্দনাইশ প্রতিনিধি >>
পাহাড়, নদী আর সবুজ অরণ্যে ঘেরা চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি। একসময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পিচঢালা সড়ক, মেঘের আনাগোনা, গহিন বন আর শঙ্খ নদীর প্রবাহ—সব মিলিয়ে ধোপাছড়ি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে সাজানো এক নৈসর্গিক জনপদ।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে ধোপাছড়িকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে দোহাজারী-লালুটিয়া ও ধোপাছড়ি বনভূমিকে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে রূপান্তরের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ধোপাছড়ি শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেই নয়, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চন্দনাইশ উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত ধোপাছড়ি ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৫৭ দশমিক ৭৭ বর্গকিলোমিটার। প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস এই ইউনিয়নে। বাঙালির পাশাপাশি মগ, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে এখানে।
ধোপাছড়ির উত্তরে রাঙ্গুনিয়া, পূর্বে পার্বত্য জেলা বান্দরবান এবং দক্ষিণে সাতকানিয়া। দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শঙ্খ নদী। পাহাড় আর নদীর মাঝখানে বিস্তৃত এই জনপদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ।
পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই হাজার একর জমিতে রয়েছে সেগুন, গর্জন, গামারি, গুটগুটিয়া, গোদা জাম, চাপালিশসহ নানা প্রজাতির বনজ গাছ। চেকথানির ছড়া, চিকনছড়া, মাঈনিছড়া, ঝিরিবুক, ডালুয়া, হরিণমারা, পরানজুরানি, গণ্ডামারা, ঝাউতলা ও চৌকিদার ফাঁড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সরকারি উদ্যোগে বনায়ন করা হয়েছে।
এই বনভূমিতে রয়েছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীও। স্থানীয়দের মতে, বিভিন্ন সময়ে বন্যহাতি, হরিণ, বানরসহ নানা প্রাণীর দেখা মেলে। ফলে জীববৈচিত্র্যের দিক থেকেও ধোপাছড়ি একটি সম্ভাবনাময় এলাকা।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য বলেন, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বনভূমি অক্ষত রেখে পরিকল্পিত পর্যটন এলাকা করা হলে এটি একটি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ ইকোপার্কের মতো পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
দুর্গমতা পেরিয়ে যোগাযোগের নতুন দুয়ার
একসময় ধোপাছড়ির সঙ্গে বাইরের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল শঙ্খ নদীর ইঞ্জিনচালিত নৌকা। দুর্গমতার কারণে সহজে এখানে যাতায়াত করা যেত না। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র।
বর্তমানে গাছবাড়িয়া থেকে ধোপাছড়ি এবং দোহাজারী-লালুটিয়া থেকে ধোপাছড়ির সঙ্গে পৃথক সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। ফলে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে তুলনামূলক কম সময়ে ধোপাছড়িতে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
পাহাড়ের উঁচুনিচু বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। বর্ষায় পাহাড়ের গায়ে মেঘের খেলা আর নিচে নদীর প্রবাহ—এই দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। তবে সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি উন্নত না হওয়ায় পর্যটনের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
গাছবাড়িয়া-ধোপাছড়ি-বান্দরবান সড়কের লট এলাহাবাদ এলাকার পূর্ব পাশে ধোপাছড়ি সীমান্তে গড়ে উঠেছে একটি পর্যটন স্পট, স্থানীয়ভাবে যেটি ‘মিনি বান্দরবান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
সড়কের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে বেড়াতে আসছেন। পাহাড়ি পথ, সবুজ বন আর মেঘে ঢাকা দৃশ্য দেখতে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। স্থানীয়দের আশা, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।
আনোয়ারা থেকে ঘুরতে আসা ভ্রমণপিপাসু মীর্জা ইকবাল বলেন, ধোপাছড়ির সঙ্গে আশপাশের পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে এখানে গড়ে উঠতে পারে একটি বড় পর্যটন অঞ্চল।
ধোপাছড়ির প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনের বিকাশে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর দোহাজারী-লালুটিয়া ও ধোপাছড়ি বনভূমিকে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আসমা শাহীন প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সরকার যে প্রস্তাব দিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে একদিকে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পরিকল্পিত পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে।
তিনি বলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন হলে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা মাঠপর্যায়ে জীববৈচিত্র্য, বন ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণার সুযোগ পাবেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণ ও পর্যটনের ভারসাম্য জরুরি
ধোপাছড়ির পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টিও সামনে আসে। অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব কিংবা বনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত মানুষের প্রবেশ এই এলাকার জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তাই স্থানীয়দের মতে, ধোপাছড়িকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকা, হাঁটার পথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বিশ্রামাগার এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণে কঠোর নজরদারি দরকার।
পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা গেলে এর সুফলও ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্থানীয়দের জন্য গাইড, পরিবহন, খাবার, হস্তশিল্প ও ছোট ব্যবসার সুযোগ তৈরি হলে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে তাদের আয়ের নতুন উৎস।
পর্যটনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরাও
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বান্দরবান ইউনিটের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সোয়েব বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনা রয়েছে ধোপাছড়িতে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদী, গহিন বন ও পাহাড়ি পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো যথেষ্ট উপাদান এখানে রয়েছে।
তাঁর মতে, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ধোপাছড়িকে একটি আদর্শ ও উন্নত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ জসিম উদ্দীন আহমেদও ধোপাছড়িতে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
ধোপাছড়িকে বলা যায় প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমি। এখানে একই সঙ্গে রয়েছে পাহাড়, নদী, বন ও জীববৈচিত্র্য। রয়েছে বৈচিত্র্যময় মানুষের বসবাস এবং সমৃদ্ধ স্থানীয় সংস্কৃতি। সবচেয়ে বড় কথা, পর্যটকদের জন্য নতুন গন্তব্য তৈরির মতো প্রাকৃতিক উপাদান এখানে আগে থেকেই বিদ্যমান।
ভ্রমণপিপাসুদের মতে, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের প্রস্তাব বাস্তবায়ন, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ধোপাছড়ি হয়ে উঠতে পারে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।
প্রকৃতি তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে। এখন সেই সৌন্দর্য রক্ষা করে পর্যটনের দুয়ার খুলে দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের। ধোপাছড়ি যেন অপেক্ষা করছে সেই উদ্যোগেরই।




















































