চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও স্বাস্থ্য বিভাগের পৃথক জরিপে নগরীতে মোট ১৫৫টি স্থানকে এডিস মশার হটস্পট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। হটস্পটের তালিকায় রয়েছে নগরীর বেশ কয়েকটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, কাপাসগোলা সিটি করপোরেশন মহিলা কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এছাড়া কাতালগঞ্জের পরিত্যক্ত ভবন, এগারো
ডাইমের বিল্ডিং, টুপিওয়ালা পাড়া, মীর নাসির গলি, মুন্সিপুকুর পাড় এবং চকবাজার কাঁচাবাজারের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানকেও এডিস মশার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) এবং স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ জরিপ ও গবেষণায় নগরীর ১৫৫টি স্থানকে এডিস মশার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করায় তার একটি চিত্র পাওয়া গেল। কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো নগরজুড়েই ডেঙ্গুর এই রূপ উদ্বেগজনক। বিষয়টি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপগুলো এত দিন অপূর্ণ ও অপরিকল্পিত ছিল। এখন আর রুটিনমাফিক প্রতিশ্রুতির সুযোগ নেই; ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে প্রয়োজন ক্রাশ প্রোগ্রাম ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পদক্ষেপ।
বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই নগরের বহুতল ভবনের জমানো পানি, নির্মাণাধীন ভবন, জলাবদ্ধ এলাকা, ড্রেন এবং পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পাত্রে এডিসের লার্ভা বংশবৃদ্ধি করছে। হটস্পটগুলো চিহ্নিত হওয়া নিঃসন্দেহে প্রাথমিক কাজ, তবে কাজের আসল পরীক্ষা শুরু এখন। শুধু স্প্রে ছিটানো বা ধোঁয়া দেওয়ার পুরোনো ও বহুল সমালোচিত পদ্ধতিতে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
সর্বপ্রথমে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে একক ছাতার নিচে এসে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্থাসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। চিহ্নিত ১৫৫টি হটস্পটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিদিন একই সময়ে কার্যকর লার্ভিসাইডিং চালাতে হবে। ওষুধ প্রয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব নির্মাণাধীন ভবন ও বাসাবাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যাবে, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের কারণে যেসব স্থানে পানি আটকে থাকে, সেসব স্থান অবিলম্বে সেচে পরিষ্কার করতে হবে। পরিচ্ছন্নতা বিভাগকে প্রতিটি ওয়ার্ডে জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে। কেবল সরকারি উদ্যোগ দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সাধারণ নাগরিকদের নিজ নিজ ঘরবাড়ি ও আঙিনা প্রতি তিন দিনে অন্তত একবার পরিষ্কার করার অভ্যাসে অভ্যস্ত করতে হবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
একই সাথে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, এনএস-১ টেস্ট কিট, আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন) এবং মশারির সুব্যবস্থা রাখতে হবে। জটিল রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) প্রস্তুতি নিশ্চিত করা চাই।
চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষের জীবন এখন ঝুঁকিতে। প্রশাসনিক আলসেমি কিংবা কাজের সমন্বয়হীনতার মাশুল আর কোনো জীবন দিয়ে পরিশোধ হতে দেওয়া যায় না। প্রতিটি হটস্পট ধরে অবিলম্বে কার্যকর অভিযান শুরু হোক—এটিই নগরবাসীর প্রত্যাশা।





















































