অ্যাডভোকেট রিদুয়ানুল হক
*وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ*
“এবং মানুষের মধ্যে হজের জন্য ঘোষণা দাও — তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং প্রতিটি যামির-এর উপর সওয়ার হয়ে, যারা আসবে প্রতিটি গভীর পথ থেকে।”
— সূরা হজ: ২৭
আর মাত্র কয়েক দিন পরেই পবিত্র হজ। ইতোমধ্যে পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমান ছুটে এসেছেন মক্কার পথে — কেউ এসেছেন ইন্দোনেশিয়া থেকে, কেউ আমেরিকা থেকে, কেউ বাংলাদেশ থেকে। কেউ বিমানে, কেউ জাহাজে, কেউ বা স্থলপথে। এই বিশাল মানবস্রোত দেখলে মনে পড়ে যায় সেই চিরন্তন আয়াতটির কথা, যেখানে হজ্জে আগমনের বর্ণনায় ব্যবহৃত একটি মাত্র শব্দ — ضَامِر (যামির) — আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। এই প্রবন্ধে সেই শব্দটির গভীরে প্রবেশের একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
১৪০০ বছর আগের যাত্রার চিত্র
কুরআন নাযিলের সময়কালে সমগ্র আরব ভূখণ্ডে যানবাহন বলতে ছিল উট, ঘোড়া ও গাধা। সেই যুগে ইরাক বা ইয়েমেন থেকে মক্কায় পৌঁছাতে লাগত দুই থেকে তিন মাস। এই বাস্তবতায় যদি কোনো মানুষ হজ্জে আগমনের বর্ণনা লিখতেন, স্বাভাবিকভাবেই উট বা ঘোড়ার উল্লেখ করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে সেই পথ বেছে নেননি।
রহস্যময় শব্দ নির্বাচন
আরবি ভাষায় উটের জন্য রয়েছে পাঁচশতেরও বেশি শব্দ। স্বয়ং কুরআনের অন্যত্র নির্দিষ্ট পশুর নাম সরাসরি এসেছে। সূরা নাহলের ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন — “এবং ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা — যাতে তোমরা আরোহণ করো।” কিন্তু হজ্জের এই আয়াতে কোনো পশুর নাম নেই, কোনো সাধারণ বিশেষ্যও নেই।
পরিবর্তে এসেছে একটিমাত্র গুণবাচক শব্দ — ضَامِر (যামির)। আভিধানিকভাবে যার অর্থ: **চিকন, পাতলা, শীর্ণকায়, ক্ষীণদেহী।
তাফসিরের ব্যাখ্যা এবং তার সীমাবদ্ধতা
ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ — ইমাম তাবারি, ইবনে কাসির প্রমুখ — ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে উটগুলো শুকিয়ে ও পাতলা হয়ে যায় — সেই অবস্থাকেই যামির বলা হচ্ছে। এই ব্যাখ্যা তৎকালীন প্রেক্ষাপটে যুক্তিসংগত। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় — পৃথিবীর প্রতিটি হাজি দুর্বল বা শুকানো উট নিয়ে আসবেন, এটি কি কোনো স্বাভাবিক বা প্রত্যাশিত চিত্র? তাছাড়া কুরআন কোনো একটি যুগের জন্য নয় — এটি কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য।
কুরআনের ভাষার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য
কুরআনের ভাষাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারী আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করেছেন। যখন কোনো বিষয় শুধু একটি নির্দিষ্ট যুগের জন্য নয়, বরং সব যুগের জন্য প্রযোজ্য — তখন আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর নাম ব্যবহার না করে *গুণবাচক বা রূপকধর্মী শব্দ* ব্যবহার করেন। এতে শব্দটি প্রতিটি যুগে নতুনভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
যদি আল্লাহ সরাসরি বলতেন “উটের পিঠে চড়ে আসবে” — তাহলে সেই বর্ণনা কেবল একটি যুগের সীমায় বন্দি হয়ে যেত। কিন্তু *যামির* শব্দটি — যার অর্থ চিকন ও পাতলা দেহবিশিষ্ট — সেই সংঘাত তৈরি হতে দেয়নি।
আধুনিক বিমানের সঙ্গে অবিশ্বাস্য সাদৃশ্য
এবার আজকের হজ্জযাত্রার প্রধান বাহন বিমানের দিকে তাকানো যাক।
বিমান প্রকৌশলের মূলনীতি হলো — বায়ুমণ্ডলের বাধা ভেদ করতে এবং উড্ডয়ন সহজ করতে বিমানের দেহকে অবশ্যই সরু, চিকন ও streamlined হতে হয়। এই নীতিকে বলা হয় Aerodynamics। বিমানের দেহ যত পাতলা ও শীর্ণ, বায়ু প্রতিরোধ তত কম, জ্বালানি সাশ্রয় তত বেশি। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক বিমান — Boeing 787 Dreamliner বা Airbus A350 — সবই এই চিকন ও দীর্ঘায়িত গঠনের অনুসরণ করে।
এই বৈশিষ্ট্য — চিকন, পাতলা, শীর্ণকায়— হুবহু যামির শব্দের আভিধানিক অর্থের সঙ্গে মিলে যায়।
“ফাজ্জিন আমিক” — গভীর পথের রহস্য
আয়াতের শেষাংশ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ-এর শাব্দিক বিশ্লেষণ: فَجّ (ফাজ্জ — মূল অর্থ দুই পাহাড়ের মাঝের সংকীর্ণ গিরিপথ; ব্যাপক অর্থে দূরবর্তী ও বিস্তৃত পথ।
عَمِيق (আমি* — অর্থ গভীর, সুদূর, অতল — যা স্বাভাবিক দৃষ্টির বাইরে।
একসঙ্গে অর্থ: “অত্যন্ত দূরবর্তী ও গভীর পথ থেকে।”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের সরাসরি আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ৪,৫০০ কিলোমিটার। কিন্তু বিমান কি শুধু সামনে এগোয়? না — এটি প্রথমে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার উপরে ওঠে, তারপর গন্তব্যে পৌঁছে আবার নিচে নামে। টেকঅফ থেকে ক্রুজিং উচ্চতায় ওঠা এবং ল্যান্ডিংয়ের সময় নামার এই উল্লম্ব দূরত্ব যোগ করলে বিমানের প্রকৃত ত্রিমাত্রিক পথ — দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা মিলিয়ে — স্থলপথের সরল দূরত্বের চেয়ে বহুগুণ বেশি এবং আক্ষরিক অর্থেই গভীর ও সুদূর।
ভূপৃষ্ঠের কোনো সড়কপথ কখনো ১০ কিলোমিটার উচ্চতার এই গভীরতা স্পর্শ করতে পারে না। মেঘের উপর দিয়ে, বায়ুমণ্ডলের স্তর ভেদ করে আসা এই পথটিই সবচেয়ে আক্ষরিক অর্থে فَجٍّ عَمِيقٍ— গভীর ও সুদূর পথ।
বর্তমান হজ্জে যানবাহন ব্যবহারের পরিসংখ্যান
আধুনিক হজ্জের পরিসংখ্যান এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন তুলে ধরে। সৌদি আরবের হজ্জ ও উমরাহ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:
– মোট হাজির প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বিদেশি, যাঁদের প্রায় ৯০ ভাগেরও বেশি আসেন বিমানে
– ২০২৪ সালের হজ্জে বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১৮ লক্ষ বিদেশি হাজি অংশ নেন
– শুধু বিমানপথে আসা হাজির সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লক্ষ
– ইন্দোনেশিয়া থেকে একাই আসেন প্রায় ২,২০,০০০ হাজি — দূরত্ব প্রায় ৭,৮০০ কিলোমিটার
– বাংলাদেশ থেকে আসেন প্রায় **৮৫,০০০ থেকে ১,২৭,০০০ হাজি
– আমেরিকা ও কানাডা থেকে আসেন প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০বহাজি — দূরত্ব ১০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে — “প্রতিটি গভীর পথ থেকে” আসার যে বর্ণনা আল্লাহ দিয়েছেন, তা আজকের যুগেই সবচেয়ে পরিপূর্ণভাবে সত্য হচ্ছে।
এটি কি একমাত্র ইঙ্গিত?
এই আয়াতটি বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। সূরা ইয়াসিনের ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন — “এবং আমি তাদের জন্য তৈরি করেছি তাদের মতো আরও বাহন, যাতে তারা আরোহণ করে।” অনেক গবেষক এই আয়াতকে আধুনিক জলযান ও বিমানের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। সূরা তাকভিরে উষ্ট্রীর পরিত্যক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা অনেক মুফাসসির আধুনিক যানবাহনের কাছে ঐতিহ্যবাহী বাহনের অপ্রাসঙ্গিকতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কুরআন কোনো একটি যুগের, একটি জাতির বা একটি ভূখণ্ডের গ্রন্থ নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য, কিয়ামত পর্যন্ত। তাই এর ভাষা এমনভাবে রচিত যা প্রতিটি যুগে নতুনভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
*ضَامِر (যামির)* — এই একটি শব্দ ১৪০০ বছর আগে শুধু শুকনো উটের কথা বলেনি। এটি ইঙ্গিত দিয়েছিল এমন এক যানের কথা, যা হবে চিকন ও পাতলা দেহের, যা আসবে পৃথিবীর সুদূর প্রান্ত থেকে — *فَجٍّ عَمِيقٍ* অর্থাৎ মেঘের ওপারের সেই গভীর আকাশপথ বেয়ে, যেখানে কোনো স্থলপথ কখনো পৌঁছায় না। আজ সেই চিত্র আমাদের চোখের সামনেই।
এটি কোনো কাকতাল নয়। এটি তাঁর বাণীর মহিমা — যিনি জানতেন, একদিন তাঁর ঘরের অতিথিরা আসবেন আকাশের বুক চিরে, চিকন পাতলা দেহের বাহনে চড়ে, পৃথিবীর প্রতিটি গভীর কোণ থেকে।
অ্যাডভোকেট রিদুয়ানুল হক : আল কুরআনের শিক্ষার্থী।






















































