ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান »
সভ্যতার অগ্রগতি নির্ভর করে মানুষের মেধা ও দক্ষতার ওপর। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই সত্যটি আরও প্রকট হয়েছে। এখন আর শুধু কাগজের সনদ দিয়ে জাতির অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হাতে কলমের শিক্ষা, প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি।
এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এখন এটি সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
কর্মমুখী শিক্ষার সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বলতে এমন শিক্ষা ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে তাত্ত্বিক পাঠের পাশাপাশি বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকে। একে ইংরেজিতে বলা হয় TVET, অর্থাৎ Technical and Vocational Education and Training।
এই শিক্ষার মূল লক্ষ্য চারটি। প্রথমত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ। তৃতীয়ত উদ্যোক্তা তৈরি। চতুর্থত দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
এর সুফল সুদূরপ্রসারী। এটি বেকারত্ব কমায়। শিল্পায়নের গতি বাড়ায়। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করে। বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি এটি তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলে।
উন্নত দেশগুলোর সফল মডেল
জার্মানি: ডুয়াল সিস্টেমের জনক
জার্মানিকে বলা হয় কারিগরি শিক্ষার রোল মডেল। তাদের বিখ্যাত ডুয়াল সিস্টেমে শিক্ষার্থী সপ্তাহে ১ থেকে ২ দিন ভোকেশনাল স্কুলে পড়ে এবং বাকি ৩ থেকে ৪ দিন সরাসরি কোম্পানিতে কাজ শেখে। সরকার, শিল্প মালিক এবং ট্রেড ইউনিয়ন মিলে এই ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
জার্মানিতে প্রায় ৩২০টি স্বীকৃত ট্রেড রয়েছে। মেকাট্রনিক্স, অটোমোবাইল, নার্সিং থেকে শুরু করে বেকারি পর্যন্ত সব খাতেই পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ আছে। ফলাফল হলো জার্মানির যুব বেকারত্বের হার ইউরোপে সবচেয়ে কম, প্রায় ৬ শতাংশের নিচে। তাদের তৈরি মেশিন ও প্রযুক্তি সারা বিশ্বে সমাদৃত।
ফিনল্যান্ড: সৃজনশীলতা ও সমতার শিক্ষা
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। নবম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীরা নিজের পছন্দমতো একাডেমিক বা ভোকেশনাল ধারা বেছে নিতে পারে।
ফিনিশ মডেলের বৈশিষ্ট্য হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখা। শিক্ষার্থীরা প্রকল্প ভিত্তিক কাজ করে। স্কুলেই থাকে অত্যাধুনিক ওয়ার্কশপ। শিক্ষকদের হতে হয় মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এবং শিল্পের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। ফলে ফিনল্যান্ড প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিশ্বে শীর্ষে।
সিঙ্গাপুর: শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ
সিঙ্গাপুর স্বাধীনতার পর বুঝেছিল প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, আছে শুধু মানুষ। তাই তারা মানুষকে সম্পদে পরিণত করেছে। সিঙ্গাপুরের ITE, Institute of Technical Education এবং পলিটেকনিকগুলো সরাসরি শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স চালায়।
সিঙ্গাপুর সরকার প্রতি বছর GDP এর একটি বড় অংশ দক্ষতা উন্নয়নে খরচ করে। SkillsFuture নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মজীবী মানুষকেও বারবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে সিঙ্গাপুরের কর্মীরা বিশ্বের সবচেয়ে উৎপাদনশীলদের মধ্যে অন্যতম।
দক্ষিণ কোরিয়া: দ্রুত উন্নয়নের গল্প
১৯৬০ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল দরিদ্র দেশ। তারা কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০ বছরের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। সরকার এবং শিল্পগোষ্ঠী যেমন স্যামসাং, হুন্দাই মিলে কারিগরি কলেজ স্থাপন করেছে। এখন কোরিয়ার রপ্তানির সিংহভাগ আসে প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প থেকে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ একটি তরুণ প্রধান দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো সাধারণ ও সনদ নির্ভর। ফলে একদিকে উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্পে দক্ষ কর্মীর অভাব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছে। অথচ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োটেকনোলজির মতো খাতে দক্ষ লোকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
আমাদের সম্ভাবনাও কম নয়। তৈরি পোশাক শিল্পে আমরা বিশ্বে দ্বিতীয়। জাহাজ নির্মাণ, চামড়া, আইসিটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত দ্রুত বাড়ছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ যায়। কিন্তু বেশিরভাগই অদক্ষ। দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্স দ্বিগুণ করা সম্ভব।
বর্তমানে দেশে ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক, ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং শতাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ NSDA কাজ করছে। তবুও মান, অবকাঠামো এবং শিল্পের সঙ্গে সংযোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের জন্য সুপারিশমালা
উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
এক. বিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে বেসিক ট্রেড, ডিজিটাল লিটারেসি এবং উদ্যোক্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
দুই. শিল্প ও শিক্ষার সমন্বয়। জার্মানির মতো প্রতিটি পলিটেকনিকের সঙ্গে নিকটবর্তী শিল্প এলাকার চুক্তি করা। শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা।
তিন. আধুনিক অবকাঠামো। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে Industry 4.0 উপযোগী ল্যাব, 3D প্রিন্টার, CNC মেশিন, সোলার প্যানেল স্থাপন করা।
চার. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন। শিল্প থেকে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আনা। শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
পাঁচ. পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন। NSDA এর মাধ্যমে প্রতি দুই বছর পর পর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা। আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন যেমন NVQ, City and Guilds এর সঙ্গে সমন্বয়।
ছয়. সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি। কারিগরি শিক্ষাকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ করার জন্য বৃত্তি, চাকরির নিশ্চয়তা এবং উদ্যোক্তা তহবিলের ব্যবস্থা করা।
সাত. নারীদের অংশগ্রহণ। নারীদের জন্য আলাদা ট্রেড যেমন গার্মেন্টস টেকনোলজি, হেলথ কেয়ার, আইটি সাপোর্টে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা।
শেষ কথা
জার্মানি, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর আমাদের শিখিয়েছে একটি সহজ সত্য। প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, মানব সম্পদই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই মানব সম্পদকে দক্ষ করে তোলার প্রধান মাধ্যম হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্মার্ট, দক্ষ এবং উদ্ভাবনী জনশক্তি।
সাধারণ শিক্ষা যেমন একটি জাতির মন গঠন করে, কারিগরি শিক্ষা তেমনি সেই জাতির হাতকে শক্তিশালী করে। তাই আজকের দিনে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য করার সময় আর নেই। দুটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারলেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
লেখক:
শিক্ষাবিদ ও গবেষক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: [email protected]




















































