‘যুদ্ধশিশু’

যুদ্ধশিশুদের নিয়ে দেশে প্রথম ‘ঐতিহাসিক’ নাটক

নিজস্ব প্রতিবেদক »

‘পৃথিবীর উন্নত দেশে বসবাস করে তারা। কোনো কিছুর অভাব নেই তাদের। অভাব আছে কেবল জন্ম-পরিচয়ের। তাই তাদের বরাবর ফিরে আসতে হয় জন্মভূমি বাংলাদেশে।’ ‘যুদ্ধশিশু’ নাটকের সংলাপ এটি।

বাংলাদেশে প্রথম যুদ্ধশিশু বিষয়ক ঐতিহাসিক ডকুমেন্টরি নাটক ‘যুদ্ধশিশু’ মঞ্চস্থ হবে ২২ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে।

ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশানের অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক জেফরি ডেভিস ‘দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড বাংলাদেশ ১৯৭১-৭২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন ‘তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রতি যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব তত বেশি বাঙালি নারীকে গর্ভবতী করার জন্য ইসলামাবাদের নির্দেশ ছিলো। এর পেছনে যুক্তি ছিলো, এর মাধ্যমে বাঙালি জাতির অখ- জাতিসত্তাকে নষ্ট করে দেওয়া যাবে যা নিয়ে তারা গর্ব করে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলো প্রচলিত একটি বিশ্বাস, যেখানে মনে করা হয়, ‘একজন উত্তম পুত্র সবার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে একমাত্র নিজের পিতা ছাড়া।’

প্রদীপ দেওয়ানজীর ‘যুদ্ধশিশু’ নাটকটি মূলত বাংলাদেশ ও বিশ্বে যুদ্ধে যৌন-সন্ত্রাসের বদৌলতে জন্ম নেওয়া এই যুদ্ধশিশুদের নিয়ে রচিত। যেখানে কমলা বেগম, জোছনা বেগম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসহ শিশু থেকে বৃদ্ধ নানা বয়সী বাঙালি নারীদের ধর্ষিত হওয়ার সত্য ঘটনাগুলো তুলে আনা হয়েছে। সেই সম্ভ্রম হারানো মুক্তিযোদ্ধা মায়েদের বাকিজীবনের টানাপোড়ন, তাদের সন্তানদের জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশে বসবাস এবং নাড়ির টানে, জন্ম- পরিচয়ের সন্ধানে ফিরে আসার গল্পই ‘যুদ্ধশিশুতে’ লিপিবদ্ধ হয়েছে।

প্রদীপ দেওয়ানজী রচিত ও সাহিদ শিসুর নির্দেশনায় ‘যুদ্ধশিশু’ নাটকটি প্রযোজনা করছে ‘থিয়েটার-জয় বাংলা’। যেখানে অভিনয় করবেন অর্পিতা আর্চায্য, অদ্বীতি দেবনাথ, দেবস্মিতা দে, তন্ময় মহাজন, পার্থ সরকার, শৈবাল চৌধুরী, কিশোর কুমার চক্রবর্তী, দেবাশীষ দাশ, ফৌজিয়া ইয়াসমীন আঁখি, ইবনে হোসেন রুদ্র।

‘থিয়েটার-জয় বাংলা’ বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ জীবন নির্ভর মৌলিক নাটকসমূহ মঞ্চায়ন করে থাকে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস ও লোককাহিনী নির্ভর দুইটি নাটক তারা মঞ্চায়ন করেছে। যার মধ্যে যশোরের বাঘাযতীনের কাহিনী নিয়ে রচিত ‘কয়া গ্রামের পালা’ (২০১৭) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার কাহিনী নিয়ে রচিত ‘কাঁদা মাখা মাইক্রোবাস’ (২০১৫) নাটক দুটি ‘থিয়েটার-জয় বাংলা’ মঞ্চায়ন করে।

এ সম্পর্কে ‘থিয়েটার-জয় বাংলা’ নাট্যদলের দল প্রধান সাহিদ শিসু বলেন,‘বাংলাদেশে যুদ্ধশিশুদের নিয়ে এখন পর্যন্ত বাস্তবকাহিনী নির্ভর কোনো নাটক হয়নি। যা হয়েছে তাতে বাস্তবতার চাইতে কল্পনার মিশেল ছিলো বেশি। কিন্তু যত সংখ্যক নারী ধর্ষিত হয়েছে তার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। অথচ এতো ভয়াবহ ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্ম কতটুকু জানে? ‘যুদ্ধশিশু’ নাটকটি শতভাগ বাস্তবকাহিনী নির্ভর। এতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষণাগ্রন্থ গুলো থেকে সংগ্রহকৃত সত্য ঘটনাগুলোই রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি যেসব সত্য চাপা পড়ে আছে সেগুলোকে যাতে আমরা আমাদের নাটকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথ তথ্যসহ পৌঁছে দিতে পারি।’

নাটকটির রচয়িতা প্রদীপ দেওয়ানজী বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস নির্ভর কাজগুলো পর্যালোচনা করে দেখলাম, একাত্তর নিয়ে আমরা অনেক বেশি কল্পনা করে ফেলেছি। কিন্তু ধরা যাক, যুদ্ধে যদি ১০ লক্ষ মানুষও মারা গিয়ে থাকে তাহলে ১০ লক্ষ ঘটনা তো নিশ্চয়ই আছে। তার মধ্যে আমি লক্ষ্য করলাম, দুটো বিষয়ে খুবই কম লেখা হয়েছে, খুব কম কাজ হয়েছে। যার একটি হলো যুদ্ধশিশু, অপরটি হলো শরণার্থী। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এ সম্পর্কে জানেই না। সেই দায়িত্ববোধ থেকে এ বিষয়ে লেখার তাড়না অনুভব করলাম এবং ইতিহাস নির্ভর বিভিন্ন গবেষণার বইগুলো থেকে তথ্য ও সত্যঘটনাগুলোকে বের করে এনে নাটকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’